সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X) অ্যাকাউন্টে মন্তব্য করেন, স্ট্রেইট অব হরমুজে কোনো মার্কিন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইরানের ‘ফ্রোজেন ফান্ড’ ব্যবহার করা হতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যের পর তেহরানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, অন্য একটি দেশের সম্পদ জব্দ করে ভবিষ্যতের অসংশ্লিষ্ট দাবির অর্থ পরিশোধে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে “উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক উদাহরণ” তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, “যদি রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে এবং কোনো দেশের সম্পদই পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে না”।
এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠতে পারে—ইরানের এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এলো কীভাবে? এবং কোনো দেশ কি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অন্য দেশের জব্দ করা সম্পদ নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে?
আমেরিকার নিকট ফ্রোজ হয়ে যাওয়া অর্থের উৎস হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগেই ইরান বিক্রি করা তেলের মূল্য যা আমদানিকারন দেশ গুলা থেকে ইরান পেতো। বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের প্রভাব এবং তেল বাণিজ্যে ডলারভিত্তিক লেনদেনের প্রচলনের কারণে (পেট্রোডলার) এসব অর্থের অনেকটাই মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব হেফাজতেই বর্তমানে আনুমানিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইরানি সম্পদ জব্দ অবস্থায় রয়েছে। এগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক বা সরকারি হেফাজতে রাখা সম্পদ, যার মধ্যে রয়েছে কয়েক দশক আগে থেকে অবরুদ্ধ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ এবং বিশেষ করে ২০১৮ সালের নিষেধাজ্ঞার বিভিন্ন পর্যায়ে, অবরুদ্ধ হওয়া ইরান সরকারের সম্পত্তি।
ইরানের সম্পদ আটকের আইনি ভিত্তি
আমেরিকা চাইলেও কোন দেশের সম্পত্তি নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করতে পারবে না কারন, কোন কোনো সম্পদ ফ্রিজ করা হলে তার মালিকানা পরিবর্তন হয় না। মূল মালিকের কাছেই সম্পদের মালিকানা থাকে, তবে ব্যবহার, স্থানান্তর বা উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সম্পদ অবরুদ্ধ করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন সরকারের সম্পত্তিতে পরিণত হয় না। ইরানের সম্পদ স্থগিত (ফ্রিজ) রাখার সিদ্ধান্তটি কোনো নতুন পদক্ষেপ নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত মার্কিন আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। এর প্রধান আইনি ভিত্তি হলো Section 203 of International Emergency Economic Powers Act (IEEPA) এবং 50 U.S.C. Chapter 53, Trading with the Enemy Act।
যদি আমেরিকা কখনো ফ্রোজেন ফান্ড ক্ষতিপূরনের জন্য ব্যবহার করতে চায় সে ক্ষেত্রে আমেরিকান পার্লামেন্টে বা সিনেট চেম্বারে কংগ্রেশানাল বিল পাশ হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া ইউএস কোর্ট জাজমেন্ট এর মাধ্যমেও এই ফান্ড ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত করে দিটে পারে, যদি কোনো দেশ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি — নিজেকে ইরান-সমর্থিত কর্মকাণ্ডের সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত (ভিক্টিম) হিসেবে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করে, এবং আদালত তার পক্ষে রায় দেয়, তাহলে সেই রায়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ফ্রোজেন সম্পদ ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি মিলতে পারে। তবে উল্লেখ্য, এই দুটি পথের যেকোনো একটি ছাড়া প্রেসিডেন্টের একতরফা সিদ্ধান্তে ফ্রোজেন তহবিল ব্যবহার আইনগতভাবে দুর্বল ও চ্যালেঞ্জযোগ্য হবে।
ইরানের ফ্রোজেন ফান্ড ব্যবহারের প্রশ্ন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ করা এবং সেই সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এ বিষয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

