ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত অন্যতম লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন ও কার্যক্রম বন্ধ করা। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর হামলায় বহু মার্কিন সেনা আহত ও নিহত হয়েছেন। ফলে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টি যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান যুক্তি হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু রাশিয়া যদি ইরানকে মার্কিন সেনাঘাঁটি ও সামরিক অবস্থানে হামলা চালানোর জন্য গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি বা সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? স্বাভাবিকভাবে এমন অভিযোগ নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্ত, কূটনৈতিক চাপ এবং কঠোর সতর্কবার্তা প্রত্যাশিত। অথচ ট্রাম্পের বক্তব্য ও আচরণে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। বরং তিনি বারবার অভিযোগগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন।
এই অবস্থান নতুন নয়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন সেনাদের ক্ষতি করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলেও ট্রাম্প অতীতেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, বিষয়টিকে ছোট করে দেখেছেন অথবা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করেছেন। বর্তমান ইরান যুদ্ধেও একই ধরনের প্রবণতা আবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থানের পার্থক্য
বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের একটি সিনেট কমিটির সামনে দেওয়া সাক্ষ্য থেকে। সেখানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ডে চীন ও রাশিয়া কোনোভাবে সহায়তা করছে কি না।
জবাবে হেগসেথ বলেন, চীন ও রাশিয়া বিভিন্ন উপায়ে ইরানের কিছু কর্মকাণ্ডকে সক্ষম করে তুলছে। তাঁর বক্তব্যে সহায়তার ধরন বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা না হলেও তিনি কার্যত স্বীকার করেন যে দুই দেশই কোনো না কোনোভাবে তেহরানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এই বক্তব্যের দুই দিন পর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের পাশে বসে থাকা অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে একই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু তিনি প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান। একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়ের অভাবকেও সামনে নিয়ে আসে।
এরপর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তাঁর নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে কার্যত দ্বিমত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, চীন ও রাশিয়া ইরান যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। কারণ দেশ দুটির নেতারা তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে তারা তেহরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে না।
ট্রাম্প পরে বলেন, তিনি চীন ও রাশিয়ার নেতাদের বিশ্বাস করেন। তাঁর ভাষায়, দেশ দুটি হয়তো কিছু কাজ করতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তা বড় ধরনের কিছু নয়। তিনি আরও বলেন, তারা সম্ভবত তাঁকে হতাশ করতে চাইবে না।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের মূল্যায়নে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক কর্মকর্তা কিংবা মিত্রদেশগুলোর তথ্যের চেয়ে বিদেশি নেতাদের ব্যক্তিগত আশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে যে অভিযোগের সঙ্গে মার্কিন সেনাদের জীবন ও নিরাপত্তা জড়িত, সেখানে এমন আস্থাভিত্তিক অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে।
মার্কিন ঘাঁটির ছবি কি ইরানের হাতে দিয়েছে মস্কো?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপগ্রহচিত্র সরবরাহ করেছে।
উপগ্রহচিত্র সাধারণ ছবি নয়। উন্নত সামরিক উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে কোনো ঘাঁটির অবস্থান, স্থাপনার বিন্যাস, বিমান বা সামরিক যানের উপস্থিতি, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করা সম্ভব। এ ধরনের তথ্য ইরানের হাতে পৌঁছালে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার পরিকল্পনা আরও নির্ভুল হতে পারে।
সোমবার ট্রাম্পকে এ অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। তাঁর মতে, এমন কিছু ঘটে থাকলেও তা হয়তো কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগটি সত্য কি না, তা খুঁজে দেখা হবে এবং তিনি পুতিনকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করবেন।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প এখন কেন বিষয়টি নিয়ে পুতিনের সঙ্গে কথা বলার কথা বলছেন? কারণ রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তথ্য দিচ্ছে—এমন অভিযোগ হঠাৎ তৈরি হয়নি।
প্রায় পাঁচ মাস আগে, মার্চের শুরুতেই একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সিএনএন জানিয়েছিল, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। অর্থাৎ বিষয়টি নতুন নয় এবং এটি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ ছিল।
পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, মস্কো ইরানকে ড্রোন এবং ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশও সরবরাহ করছে। অবশ্য রুশ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অভিযোগ অস্বীকার নয়, গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো
মার্চে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য দেখে মনে হচ্ছে, এ ধরনের সহায়তা হয়ে থাকলেও তা বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করতে পারেনি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিটও তখন বলেছিলেন, রাশিয়ার সহায়তা সত্য কি না, তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ ট্রাম্প ও মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি সরকারকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই বক্তব্যে সামরিক ফলাফলের ওপর জোর দেওয়া হলেও একটি মৌলিক নিরাপত্তা প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়। কোনো বিদেশি শক্তি যদি মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য শত্রুপক্ষকে তথ্য দেয়, তাহলে সেই তথ্য ব্যবহার করে হামলা সফল হয়েছে কি না—শুধু সেটিই বিবেচ্য নয়। এমন সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর শত্রুতামূলক পদক্ষেপ।
হামলা ব্যর্থ হলেও গোয়েন্দা সহায়তার উদ্দেশ্য বদলে যায় না। তাই কেবল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফল দিয়ে অভিযোগটির গুরুত্ব বিচার করা যথেষ্ট নয়।
কঠোর বার্তা দিয়েছেন আলোচক, কিন্তু ট্রাম্প নন
রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের পক্ষে আলোচনায় যুক্ত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, তিনি রাশিয়াকে কঠোরভাবে বলেছেন যেন ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য বা অন্য কোনো সহায়তা দেওয়া না হয়।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে প্রকাশ্যে এতটা দৃঢ় অবস্থান নেননি। তিনি পুতিনকে সরাসরি সতর্ক করেছেন বা এমন সহায়তাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অগ্রহণযোগ্য সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছেন—এমন স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের হামলায় চলতি মাসেও নতুন করে মার্কিন নাগরিক বা সেনা নিহত হওয়ার পর বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের বক্তব্যে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে তীব্র উদ্বেগের বদলে সন্দেহ, অপেক্ষা এবং পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার ওপর নির্ভরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এতে মস্কোর কাছে এমন একটি বার্তা যেতে পারে যে, ইরানকে সীমিতভাবে সহায়তা করলেও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া নাও আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের ধারণা ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে পারে।
প্রথম মেয়াদেও একই ধরনের অভিযোগ
রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করার অভিযোগ ট্রাম্পের কাছে নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদেও এমন একটি ঘটনা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে খবর প্রকাশিত হয়, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের হত্যার জন্য রাশিয়া তালেবান-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের অর্থ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। ট্রাম্প তখন দাবি করেন, তাঁকে বিষয়টি নিয়ে মৌখিকভাবে জানানো হয়নি।
কিন্তু সিএনএনসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের দৈনিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরও জানা যায়, ২০১৯ সালের শুরুর দিক থেকেই হোয়াইট হাউস এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল।
ট্রাম্প নিয়মিতভাবে তাঁর দৈনিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পূর্ণ পড়তেন না বলে অভিযোগ ছিল। ফলে কোনো তথ্য লিখিতভাবে তাঁর কাছে পৌঁছালেও তিনি সেটি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
তৎকালীন সময়ে ট্রাম্প রাশিয়ার অর্থ পুরস্কারের অভিযোগকে সম্ভাব্য মিথ্যা খবর বা রাজনৈতিক অপপ্রচার হিসেবে তুলে ধরেন। খবর প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর তিনি স্বীকার করেন, পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে বিষয়টি তোলেননি।
তিনি বলেছিলেন, পুতিনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তাঁর কখনো আলোচনা হয়নি, তবে আলোচনা করতে তাঁর কোনো সমস্যা নেই। এই বক্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। এখনো তিনি বলছেন, অভিযোগটি পুতিনকে জিজ্ঞাসা করবেন। অথচ অভিযোগ প্রকাশের পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে।
গোয়েন্দা তথ্য পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়
ট্রাম্প প্রশাসন সে সময় জোর দিয়ে বলেছিল, রাশিয়ার অর্থ পুরস্কার দেওয়ার গোয়েন্দা তথ্য নিশ্চিত নয়। ২০২১ সালে জো বাইডেনের প্রশাসনও জানায়, ওই তথ্যের বিষয়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার আস্থা ছিল নিম্ন থেকে মাঝারি পর্যায়ের।
তবে গোয়েন্দা তথ্য শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া মানে অভিযোগটি মিথ্যা—এমন নয়। গোয়েন্দা মূল্যায়নে নিম্ন বা মাঝারি আস্থা বলতে সাধারণত বোঝায়, তথ্যের কিছু ভিত্তি রয়েছে, কিন্তু তা পুরোপুরি যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যখন মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে থাকে, তখন এমন তথ্যও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব শুধু নিশ্চিত হামলার প্রতিক্রিয়া জানানো নয়; সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ।
কিন্তু ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করেন, এরপর যুক্তরাষ্ট্রও অতীতে একই ধরনের কাজ করেছে বলে তুলনা টানেন এবং শেষ পর্যন্ত পুতিনের ব্যক্তিগত বক্তব্যের ওপর আস্থা রাখেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে একই কাতারে দেখার প্রবণতা
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প রাশিয়ার সম্ভাব্য অর্থ পুরস্কারের বিষয়টিকে আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা যোদ্ধাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
মার্চেও তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া হয়তো দাবি করতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কাজ করে।
এই যুক্তির সমস্যা শুধু নৈতিক নয়, কৌশলগতও। যুক্তরাষ্ট্র অতীতে কী করেছে, সেই বিতর্ক আলাদা। কিন্তু বর্তমান সময়ে কোনো দেশ মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করতে শত্রুপক্ষকে সহায়তা করছে কি না, সেটি নির্ধারণে অতীতের পাল্টা উদাহরণ মূল অভিযোগকে বাতিল করে না।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হয় তার বর্তমান উদ্দেশ্য, সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে। যুক্তরাষ্ট্রও অন্য দেশে একই ধরনের কাজ করেছে—এমন যুক্তি ব্যবহার করলে রাশিয়ার সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আস্থা
ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে পুতিনের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আস্থা বহুবার আলোচনায় এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন এবং রুশ প্রেসিডেন্টের অস্বীকারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে ট্রাম্প অনেক ক্ষেত্রেই পুতিনের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাশিয়া ও চীনের সহায়তার কথা বলছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট উপগ্রহচিত্র দেওয়ার অভিযোগ তুলছেন। মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ড্রোন এবং গোয়েন্দা সহায়তার আশঙ্কা করছেন। তবু ট্রাম্প বলছেন, তিনি রুশ ও চীনা নেতাদের বিশ্বাস করেন।
একজন রাষ্ট্রনেতার জন্য অন্য দেশের নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনোই জাতীয় নিরাপত্তা মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের নেতা যখন অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তখন তাঁর অস্বীকারকে স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
রাশিয়ার জন্য কী বার্তা তৈরি হচ্ছে?
ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, এতে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার সীমা সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারে।
মস্কো যদি মনে করে, ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য বা সামরিক প্রযুক্তি দেওয়ার পরও ট্রাম্প বিষয়টিকে বড় করে দেখবেন না, তাহলে ভবিষ্যতে রুশ সহায়তার মাত্রা বাড়তে পারে। সরাসরি অস্ত্র পাঠানো ছাড়াও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য, যোগাযোগ প্রযুক্তি, ড্রোনের যন্ত্রাংশ, নজরদারি সহায়তা কিংবা সামরিক পরামর্শ যুদ্ধের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ধরনের সহায়তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর সীমারেখা নির্ধারণ না করলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তারা প্রশ্ন তুলতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সেনাদের বিরুদ্ধে সহায়তার অভিযোগেও যদি ওয়াশিংটন দৃঢ় না হয়, তাহলে মিত্রদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র কতটা কঠোর হবে?
ট্রাম্প কি সত্য জানতে চান, নাকি সম্পর্ক রক্ষা করতে চান?
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি পুতিনকে অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। কিন্তু পুতিনের কাছে প্রশ্ন করা এবং স্বাধীনভাবে সত্য উদ্ঘাটন করা এক বিষয় নয়।
রাশিয়া আগেই অস্ত্র, ড্রোন বা গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে শুধু পুতিনের উত্তর শুনে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য উপগ্রহ তথ্য, অস্ত্রের উৎস, যোগাযোগের নথি, আটক করা ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং মিত্রদেশগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ট্রাম্প যদি সত্যিই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে চান, তাহলে তাঁর প্রশাসনকে একটি সমন্বিত তদন্তের ফল প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি রাশিয়াকে জানাতে হবে, মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করতে কোনো ধরনের সহায়তা দিলে তার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক পরিণতি হবে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর বক্তব্যে সেই দৃঢ়তা অনুপস্থিত। বরং তিনি বারবার বলেছেন, সহায়তা হয়ে থাকলেও তা বড় কিছু নয় বা যুদ্ধের ফলাফলে প্রভাব ফেলেনি।
মূল প্রশ্নটি মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ট্রাম্প-পুতিন ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা দলীয় রাজনীতি থাকার কথা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কোনো বিদেশি সরকার কি ইরানকে মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত ও আক্রমণ করতে সহায়তা করেছে?
উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শত্রুতামূলক পদক্ষেপ। আর উত্তর যদি এখনো নিশ্চিত না হয়, তাহলেও অভিযোগটি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে মার্কিন সেনাদের রক্ষা এবং তেহরানের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু একই সেনাদের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে তাঁর অনাগ্রহ সেই যুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইরানকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে নমনীয়তা—এই দ্বৈত অবস্থান ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
রাশিয়া সত্যিই ইরানকে মার্কিন ঘাঁটির উপগ্রহচিত্র, ড্রোন, যন্ত্রাংশ বা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য দিয়েছে কি না, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে অভিযোগগুলো এতটাই গুরুতর যে সেগুলোকে শুধু পুতিনের আশ্বাস বা যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক ফলাফল দিয়ে উপেক্ষা করা যায় না।
একজন প্রেসিডেন্টের কাছে মার্কিন সেনাদের জীবন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলায় কোনো বিদেশি শক্তির সহায়তার সামান্য আশঙ্কাও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করার কথা।
কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্যে এখন পর্যন্ত উদ্বেগের চেয়ে আস্থা, তদন্তের চেয়ে অপেক্ষা এবং কঠোর সতর্কতার চেয়ে অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
ফলে প্রশ্নটি শুধু রাশিয়া ইরানকে সহায়তা করছে কি না, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—এমন সহায়তা সত্য প্রমাণিত হলেও ট্রাম্প কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত? নাকি পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখাই তাঁর কাছে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য রুশ ভূমিকার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

