বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির খবরে ইসরায়েলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই চুক্তি সৌদি আরবকে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে ঠেলে দিতে পারে।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট হয়তো ইসরায়েলিদের কিছু উদ্বেগ প্রশমিত করেছে।
ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে বলা হয়েছে যে, পারমাণবিক চুক্তিটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করবে এবং সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য করবে।
ট্রাম্পের পোস্টের পর, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এই খবরটিকে আব্রাহাম চুক্তির বিজয় হিসেবে উদযাপন করেছে। আব্রাহাম চুক্তি হলো ২০২০ সালে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত একটি স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি।
চুক্তিটি সম্পর্কে ট্রাম্পের বর্ণনা শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হোক বা না হোক, তার পোস্টটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি এমন কিছু প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে যা চুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করবে।
চুক্তিটি কি অভ্যন্তরীণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেয়? আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) পর্যবেক্ষণে কী পরিমাণে জড়িত থাকবে?
ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ কি এই চুক্তির অংশ? এই চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবিকাশমান কৌশলগত ভারসাম্য সম্পর্কে কী প্রকাশ করে?
স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে সন্দেহ
পোস্টটি সম্ভবত ইসরায়েলি চাপের ফল ছিল, কিন্তু ট্রাম্পের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং স্বাভাবিকীকরণ সংক্রান্ত ঘোষণার সত্যতা সন্দেহজনক।
এমনটা হতে পারে যে, ট্রাম্পের পোস্টে যেমনটা ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইতিমধ্যেই সম্মত হয়েছেন।
তবে, সম্ভাবনা বেশি যে, ট্রাম্পের পোস্টটি ছিল তার প্রশাসনের ইতোমধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তির শর্তাবলীকে পূর্ববর্তী তারিখ থেকে কার্যকর করে পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে তিনি কার্যত যুবরাজকে ঘটনার পরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে রাজি হতে চাপ প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের পোস্টের বিষয়ে সৌদি সরকার এখন পর্যন্ত নীরব রয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন যে, মাসব্যাপী পারমাণবিক আলোচনা চলাকালে ইসরায়েলকে সৌদি আরবের স্বীকৃতির কথা কখনোই উল্লেখ করা হয়নি।
সম্ভবত আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বুধবার মার্কিন জ্বালানি দপ্তর এবং সৌদি সংবাদ সংস্থা কর্তৃক পারমাণবিক চুক্তি সংক্রান্ত যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে , তাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কোনো উল্লেখ ছিল না।
রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বোঝা যায় যে, সৌদিরা এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হবে না, যার জন্য তাদের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ধারণার প্রতি পরীক্ষামূলক উন্মুক্ততার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি ছিল গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা শুরু হওয়ার এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাদের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ কর্মসূচির নাটকীয় গতিবৃদ্ধির আগের ঘটনা।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি নেতারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বারবার নিন্দা করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি আর আলোচনার টেবিলে নেই।
ফিলিস্তিন ফ্রন্টে এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায়— খুব বড় ধরনের অগ্রগতি না হলে, সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ অসম্ভাব্য, এমনকি পুরোপুরি অসম্ভব বলেই মনে হয়।
জানা গেছে, যুবরাজ মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বলেছেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো চুক্তি সৌদি আরবে এতটাই অজনপ্রিয় হবে যে এর ফলে তাকে হত্যাও করা হতে পারে।
সৌদিরা যদি সত্যিই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধী হয়, তাহলে মোহাম্মদ বিন সালমান সম্ভবত ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টটি অসন্তোষজনকভাবে পড়েছেন। শুধু এই একটি বিষয়ই চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
তবে, এই পর্যায়ে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো, ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি আলোচনা অনুযায়ীই কার্যকর হবে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রকৃতপক্ষে এর অন্যতম শর্ত নয়।
কৌশলগত স্বার্থ
শেষ পর্যন্ত, ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও, পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন ও রিয়াদ উভয়ের কাছেই জোরালো কারণ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর কৌশলগত যুক্তিটি খুবই সহজ। বছরের পর বছর ধরে, প্রথমে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে এবং এখন ট্রাম্পের আমলে, ওয়াশিংটন আশঙ্কা করে আসছে যে সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করলে তা রিয়াদকে চীন বা রাশিয়ার দিকেই ঠেলে দেবে । যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে না তোলে, তবে বেইজিং বা মস্কো প্রায় নিশ্চিতভাবেই তা করবে।
এই চুক্তিটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন শুধু সৌদি আরবকে আমেরিকার কৌশলগত বলয়ের মধ্যে দৃঢ়ভাবে রাখতেই সাহায্য করে না, বরং আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসায়িক সুযোগও নিশ্চিত করে ।
সৌদি আরবের জন্য, এই চুক্তিটি তেলনির্ভরতা থেকে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার দেশটির দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং একই সাথে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তিটি সৌদিদেরকে একটি পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে আসবে।
মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে সৌদি আরবও দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে হাঁটবে।
বরং, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ ইরানের আঞ্চলিক শক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে থাকতে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের সময়ের চেয়ে ইরানিরা আজ হয়তো আরও শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এছাড়াও, তেহরান হয়তো হিসাব কষেছে যে, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ইসরায়েলি ও আমেরিকান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রই হবে তাদের সর্বোত্তম সুরক্ষা।
একই সময়ে, ইরানি নেতারা যুদ্ধের আগের তুলনায় অধিক কৌশলগত আত্মবিশ্বাসের অবস্থান থেকে আলোচনা করছেন বলে মনে হচ্ছে।
সৌদি আরবের সাথে পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাবনা এবং ইরানের শক্তিশালী দর কষাকষির অবস্থান, এই দুটি বিষয় একত্রিত হয়ে তেহরানকে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ভবিষ্যতের যেকোনো পারমাণবিক আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য আরও অনুকূল শর্ত দাবি করতে প্ররোচিত করতে পারে।
কী অনুপস্থিত
এই প্রেক্ষাপটেই মার্কিন-সৌদি চুক্তিতে যা অনুপস্থিত, তা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
অধিকন্তু এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই চুক্তিতে আইএএইএ-এর পর্যবেক্ষণের কোনো আবশ্যকতা অন্তর্ভুক্ত আছে বলে মনে হয় না।
আইএইএ-এর পর্যবেক্ষণমূলক ভূমিকার অনুপস্থিতি এবং ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা, শুধু তেল আবিবেই নয়, তেহরানেও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রায় নিশ্চিতভাবেই বাড়িয়ে তুলবে।
ঠিক এই বিবরণগুলোই ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক চুক্তির মূল বিষয়বস্তু নির্ধারণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পর্যবেক্ষণের বিষয়ে সৌদি আরবকে আরও বেশি নমনীয়তা দিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে ইরানের আলোচক দলও প্রায় নিশ্চিতভাবেই অনুরূপ আচরণের দাবি জানাবে।
শেষ পর্যন্ত এটিই পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিকীকরণের প্রধান অনুঘটক হিসেবে স্মরণ করা হতে পারে এবং সৌদি ও ইরানের চলমান পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শন এই অঞ্চলে একটি ডমিনো প্রভাব সৃষ্টি করছে।
যদি তেহরান ও রিয়াদ শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে মিশর ও তুরস্ক এবং সম্ভবত অন্যরাও— একই পথ অনুসরণের চাপের সম্মুখীন হবে।
পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তারকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং উপসাগর জুড়ে ইরানের আগ্রাসী সামরিক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হয়তো এই অঞ্চলের সরকারগুলোকে এই বিশ্বাসে উপনীত করেছে যে, সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
সৌদি আরবের জন্য, এই ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রাথমিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে, অন্যান্য অনেক আঞ্চলিক পক্ষের কাছে, পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্ভবত ইসরায়েল এবং তার সম্প্রসারণবাদী ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের বিরুদ্ধে সুরক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাহলে, ইচ্ছাকৃত হোক বা না হোক, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব হয়তো ঠিক সেই আঞ্চলিক পারমাণবিকীকরণকেই ত্বরান্বিত করেছে, যার বিরুদ্ধে কাজ করার দাবি তারা করে থাকে।
এই অর্থে, মার্কিন-সৌদি পারমাণবিক চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত মার্কিন কূটনীতির সাফল্যের প্রতীক না হয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন কৌশলগত যুগের সূচনা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে, যেখানে পারমাণবিক সক্ষমতাকে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হবে।
- মোহামাদ এলমাসরি: দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ-এর মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

