চলতি মাসের শুরুতে পেনসিলভানিয়ায় প্রতিরক্ষা ও উদ্ভাবনবিষয়ক এক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—আরও অস্ত্র তৈরি করতে হবে এবং উৎপাদনের গতি বাড়াতে হবে।
ট্রাম্পের পাশে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। উপস্থিত অস্ত্র নির্মাতাদের উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিশ্বের সেরা অস্ত্র রয়েছে, তবে এখন প্রয়োজন আরও দ্রুত উৎপাদন।
বাইরে থেকে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার স্বাভাবিক উদ্যোগ বলে মনে হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনও সম্মেলনটিকে মার্কিন শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেছে।
কিন্তু এর পেছনে আরও জরুরি একটি বাস্তবতা রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ দিনের তীব্র সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব অস্ত্রের অনেকগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দ্রুত উৎপাদন করাও সম্ভব নয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের পেছনে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার সমান। এই অর্থের বড় অংশই অস্ত্র ও গোলাবারুদের পেছনে খরচ হয়েছে।
৮ এপ্রিল নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ১ হাজার ৭০০টির বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু যুদ্ধের তীব্রতাই প্রকাশ করে না। এগুলো দেখায়, কয়েক সপ্তাহের একটি সংঘাতও কীভাবে বহু বছরের জন্য তৈরি করা অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।
ট্রাম্প বলছেন অস্ত্রের অভাব নেই
বর্তমানে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ইরানে হামলা বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই বিরতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিশ্চিত নয়।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত আরও কমে যেতে পারত।
কিন্তু সোমবার অস্ত্রের ঘাটতির আশঙ্কা সরাসরি অস্বীকার করেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি গোলাবারুদ রয়েছে। এমনকি প্রয়োজনের তুলনায়ও তাদের মজুত অনেক বেশি।
ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য পুরোপুরি মেলে না।
গত মাসে অস্ত্রের সরবরাহ কমে আসা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথও প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু গত সপ্তাহে সিনেটের বরাদ্দবিষয়ক কমিটির সামনে তিনি বলেন, সামরিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি পূরণে প্রতিরক্ষা দপ্তরের আরও ৮৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
অর্থাৎ প্রকাশ্যে অস্ত্রের সংকট নেই বলা হলেও ভেতরে ভেতরে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হচ্ছে। ঠিক কত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং বর্তমানে কত মজুত রয়েছে, সে তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
এই গোপনীয়তার একটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কোনো দেশের অস্ত্রের সঠিক মজুত প্রকাশ করলে প্রতিপক্ষ তার সামরিক দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। তবে তথ্য গোপন থাকার কারণে ট্রাম্পের আশ্বাস কতটা বাস্তব এবং কতটা রাজনৈতিক বক্তব্য, তা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে কয়েক বছর লাগে
ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহ করা তথ্য বলছে, ইরান যুদ্ধে ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অর্থ থাকলেই তাৎক্ষণিকভাবে এসব অস্ত্র তৈরি করা যায় না।
অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল ও সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ধরন অনুযায়ী এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। উৎপাদনের এই দীর্ঘ সময় হঠাৎ করে কমিয়ে আনার সহজ কোনো উপায়ও নেই।
আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের বিস্ফোরক, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, নির্দেশনা ব্যবস্থা, সেন্সর, ইঞ্জিন এবং প্রশিক্ষিত জনশক্তি প্রয়োজন। এসব উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও সীমিত।
ফলে আজ নতুন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অর্থে তৈরি অস্ত্র মার্কিন বাহিনীর হাতে পৌঁছাতে তিন, চার বা পাঁচ বছর লেগে যেতে পারে।
এই বাস্তবতা যুদ্ধকালীন ব্যয়ের হিসাবকে আরও জটিল করে তোলে। একটি সংঘাতে ব্যবহৃত অস্ত্রের অর্থমূল্য শুধু বর্তমান ব্যয় নয়; এর সঙ্গে ভবিষ্যতে সেই অস্ত্র পুনরায় তৈরি করতে প্রয়োজনীয় সময় ও শিল্প সক্ষমতার প্রশ্নও যুক্ত থাকে।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে বড় ধাক্কা
ইরানের স্থলভাগে দূরপাল্লার হামলায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর একটি ছিল টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র। জাহাজ বা সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্র ১ হাজার মাইল বা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
এটি এমন সব সামরিক স্থাপনায় হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়, যেখানে সরাসরি যুদ্ধবিমান পাঠানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গভীর বাংকার, সুরক্ষিত ঘাঁটি, যোগাযোগকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাকে নির্ভুলভাবে আঘাত করার সক্ষমতা রয়েছে এর।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে ১ হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই বিপুল ব্যবহার পূরণ করে যুদ্ধের আগের মজুত ফিরে পেতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। টমাহকের সর্বশেষ সংস্করণের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক দাম ২৬ লাখ ডলার।
অর্থাৎ শুধু টমাহক ব্যবহারের আর্থিক মূল্যই কয়েক শ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে অর্থের চেয়েও বড় বিষয় হলো, আগামী কয়েক বছরে নতুন কোনো বড় সংঘাত শুরু হলে একই মাত্রায় টমাহক ব্যবহারের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে কি না।
সস্তা ড্রোন ঠেকাতে কোটি ডলারের অস্ত্র
ইরানের হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে।
ভূমিভিত্তিক এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা যায়। বহু বছর ধরে প্যাট্রিয়টকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৩০টি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিটি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
কিন্তু এসব ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের অনেকগুলো ব্যবহার করা হয়েছে ইরানের এমন ড্রোন ধ্বংস করতে, যেগুলোর প্রতিটির মূল্য মাত্র ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে।
এখানেই আধুনিক যুদ্ধের বড় অর্থনৈতিক সমস্যা স্পষ্ট হয়। প্রতিপক্ষ যদি কম দামের শত শত ড্রোন পাঠায় এবং সেগুলো ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিবার কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়, তাহলে সামরিকভাবে সফল হলেও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষাকারী দেশ বড় চাপে পড়ে।
একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে কয়েক শ গুণ বেশি দামের অস্ত্র ব্যবহারের এই ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টেকসই নয়।
থাড ব্যবস্থার মজুতও সীমিত
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক নতুন ও উন্নত থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ব্যবহার করেছে।
প্যাট্রিয়টের তুলনায় থাডের পাল্লা বেশি। এটি আরও উঁচুতে উড়তে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। ফলে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে যুদ্ধের আগেই থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত ছিল।
হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আনুমানিক ৩৬০টি থাড প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। সংঘাতে এর মধ্যে প্রায় ১৯০ থেকে ২৯০টি পর্যন্ত নিক্ষেপ করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কার্যকর থাড ব্যাটারির সংখ্যা মাত্র নয়টি। এর মধ্যে সাতটিই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
এত সীমিত একটি ব্যবস্থার বিপুল অংশ একটি যুদ্ধেই ব্যবহার হয়ে গেলে ভবিষ্যতে রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
বিশেষ করে থাডের মতো জটিল অস্ত্র দ্রুত উৎপাদন করা সম্ভব নয়। ফলে ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রতিটি থাড ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা থেকেও একটি করে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র কমিয়ে দিয়েছে।
তাইওয়ান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধ এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২১ সালে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন সতর্ক করেছিলেন, পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যে চীন তাইওয়ানে হামলার চেষ্টা করতে পারে।
২০২৩ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে চীন তাইওয়ানে হামলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে।
চীন স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। দ্বীপটির সঙ্গে পুনরায় একীভূত হওয়ার অঙ্গীকারও করে আসছে বেইজিং। প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তারা নাকচ করেনি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র দিয়ে থাকে। তবে চীন হামলা করলে মার্কিন বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো কৌশলগত অস্পষ্টতা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অস্ত্র ব্যয়কে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশান্ত মহাসাগরে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।
ক্যানসিয়ানের মতে, বর্তমান অস্ত্রঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ সময় তৈরি করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরে সংঘাত শুরু হলে প্রয়োজনীয় ও পছন্দের অস্ত্র পর্যাপ্ত পরিমাণে নাও থাকতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করেছে, তা চীন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।
এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুদ্ধ করেনি; একই সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, অস্ত্র ব্যবহারের হার এবং সম্ভাব্য দুর্বলতার একটি বাস্তব প্রদর্শনীও প্রতিপক্ষের সামনে তুলে ধরেছে।
চীনের অস্ত্র ইরানের চেয়ে অনেক উন্নত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
বেইজিংয়ের হাতে এমন উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো ইরানের ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
চীন একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন একযোগে ব্যবহারের কৌশল নিয়েও কাজ করছে। শত শত বা হাজার হাজার ড্রোন একসঙ্গে পাঠানো হলে যে কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ইরানের তুলনামূলক কম উন্নত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতেই যদি যুক্তরাষ্ট্রকে এত বেশি প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যবহার করতে হয়, তাহলে চীনের আরও উন্নত এবং বৃহৎ অস্ত্রভাণ্ডারের বিরুদ্ধে পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের পুরো ঘটনাকে সবাই দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন না।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, অস্ত্র মজুত করে রাখলেই প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয় না। প্রয়োজন হলে সেই অস্ত্র কার্যকরভাবে ব্যবহার করার রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সামরিক সক্ষমতাও দেখাতে হয়।
ইরানে দ্রুত ও নির্ভুল হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনসহ অন্য প্রতিপক্ষকে এই বার্তা দিয়েছে যে, তারা শুধু অস্ত্রের মালিক নয়; প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করতেও প্রস্তুত।
ইউক্রেনের জন্যও কমতে পারে অস্ত্র
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপের প্রভাব শুধু তাইওয়ান পর্যন্ত সীমিত নয়। ইউক্রেনও এর সরাসরি ফল ভোগ করতে পারে।
অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প ইউক্রেনকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে ইউক্রেন নিয়মিত রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে। এসব হামলা ঠেকাতে কিয়েভের জরুরিভাবে প্যাট্রিয়ট এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র প্রয়োজন।
কিন্তু একই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ইরান যুদ্ধেও বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মিত্র ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়া এবং নিজেদের মজুত রক্ষা করার মধ্যে ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হচ্ছে।
মার্চে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু জ্বালানির মূল্য বাড়াচ্ছে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের উৎপাদনের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মাসে আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। বছরে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি। অথচ অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম দিনেই ব্যবহার করা হয়েছিল ৮০৩টি।
এই তুলনা সমস্যাটির গভীরতা স্পষ্ট করে। একটি দেশের বার্ষিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র যদি এক দিনেই ব্যবহার করা হয়, তাহলে শুধু অর্থ বাড়িয়ে স্বল্প সময়ে ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়।
পুরোনো যুদ্ধব্যবস্থা কি খুব ব্যয়বহুল?
ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে।
এক হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে এখন কম খরচে, সহজে উৎপাদনযোগ্য এবং বড় সংখ্যায় মোতায়েন করা যায়—এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত কার্যকর হলেও এগুলো ব্যয়বহুল এবং উৎপাদনে দীর্ঘ সময় লাগে। অন্যদিকে কম দামের ড্রোন দ্রুত ও বিপুলসংখ্যায় তৈরি করা যায়।
ভবিষ্যতের যুদ্ধে বিজয় শুধু কার অস্ত্র সবচেয়ে উন্নত, তার ওপর নির্ভর করবে না। কার অস্ত্র দ্রুত, কম খরচে এবং বেশি সংখ্যায় উৎপাদন করা যায়, সেটিও বড় ভূমিকা রাখবে।
এই কারণে বৈদ্যুতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জালভিত্তিক ড্রোন প্রতিরোধ, স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত কামানব্যবস্থা তৈরির দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ বাড়তে পারে।
ইরানের অবস্থাও ভালো নয়
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার কমলেও শিগগিরই দেশটির গোলাবারুদ পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা নেই।
এর একটি বড় কারণ হলো, ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সামরিক স্থাপনা এবং উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। এসব ক্ষতি দ্রুত পূরণ করার মতো অর্থনৈতিক ও শিল্প সক্ষমতাও তেহরানের সীমিত।
হোয়াইট হাউসের দাবি, ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের আরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে একটি স্পষ্ট দ্বৈততা রয়েছে।
একদিকে বলা হচ্ছে, মজুত যথেষ্ট। অন্যদিকে আরও দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এতে ধারণা করা যায়, তাৎক্ষণিক যুদ্ধ পরিচালনার মতো অস্ত্র থাকলেও ভবিষ্যতের একাধিক সংঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারও সীমাহীন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যাপকভাবে উৎপাদনের সক্ষমতাও অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
ইরান এখন নিজেদের অবশিষ্ট অস্ত্রকে শেষ বড় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সক্ষমতাও কমছে।
মূল সংকট কোথায়?
এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অস্ত্রহীন হয়ে পড়েনি। তাৎক্ষণিক সংকটও হয়তো তৈরি হয়নি।
আসল সমস্যা হলো, বর্তমান অস্ত্র ব্যবহারের হার দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব কি না।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান মোকাবিলা করতে হচ্ছে, ইউক্রেনকে অস্ত্র দিতে হচ্ছে, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য চীনা হামলার প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে।
এই চারটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনেক অস্ত্র একই ধরনের—টমাহক, প্যাট্রিয়ট, থাড এবং অন্যান্য দূরপাল্লার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র।
ইরানে নিক্ষেপ করা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে পাঠানো যাচ্ছে না। ইউক্রেনে দেওয়া প্রতিটি অস্ত্র তাইওয়ানের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। আবার তাইওয়ানের জন্য অস্ত্র রেখে দিলে মধ্যপ্রাচ্যে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
ফলে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এখন শুধু একটি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বৈশ্বিক সামরিক পরিকল্পনার অংশ।
ট্রাম্পের সামনে কঠিন হিসাব
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু তাঁর প্রশাসন অতিরিক্ত ৮৭ বিলিয়ন ডলার চাচ্ছে, অস্ত্র নির্মাতাদের উৎপাদন বাড়াতে বলা হচ্ছে এবং সামরিক বিশ্লেষকেরা মজুত পুনর্গঠনে কয়েক বছর লাগার সতর্কতা দিচ্ছেন।
এ থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাৎক্ষণিক অস্ত্রশূন্যতার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সংকট বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শন করেছে। দেশটি দেখিয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার সক্ষমতা তার রয়েছে।
কিন্তু একই যুদ্ধ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনেছে—এই মাত্রার অস্ত্র ব্যবহার কতবার করা সম্ভব?
যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, ইউক্রেনে রুশ হামলা বাড়ে কিংবা তাইওয়ান ঘিরে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক ফ্রন্টে অস্ত্র ভাগ করে দিতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে উৎপাদন কারখানা সম্প্রসারণ, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রশিক্ষিত কর্মী বাড়ানো এবং কম খরচে নতুন অস্ত্র তৈরি করা।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
বর্তমানে ওয়াশিংটনের হিসাব হলো, অস্ত্র উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানো পর্যন্ত ইরান সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
কিন্তু এই কৌশল সফল হবে কি না, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হয়, ইউক্রেনের যুদ্ধ কোন দিকে যায় এবং তাইওয়ান নিয়ে চীন কতটা আক্রমণাত্মক হয়—এসব বিষয় অস্ত্রের মজুতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
তা ছাড়া প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিই উৎপাদনের গতি বাড়াতে পারবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে যখন তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে, তখন রাজনৈতিক নির্দেশ দিলেই কয়েক মাসের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব নয়।
ইরান যুদ্ধ তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির গল্প নয়। এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের সীমাবদ্ধতা, ব্যয়বহুল যুদ্ধব্যবস্থা এবং একসঙ্গে একাধিক বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তবে প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে তার মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ছোট হচ্ছে।
ইরানে ছোড়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র, ইউক্রেনে পাঠানো প্রতিটি প্রতিরক্ষা অস্ত্র এবং তাইওয়ানের জন্য সংরক্ষিত প্রতিটি গোলাবারুদ একই সীমিত অস্ত্রভাণ্ডারের অংশ।
ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন শুধু আরও অস্ত্র তৈরির চ্যালেঞ্জ নয়। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কোন মিত্রকে কত অস্ত্র দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতের বড় সংঘাতের জন্য কতটা মজুত সংরক্ষণ করা হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো তাৎক্ষণিক সামরিক সাফল্য দিয়েছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কতটা বড় হবে, সেই হিসাব এখনো শেষ হয়নি।

