আজ (১ আগস্ট) থেকে দেশের সব গণপরিবহনে জিপিএস বা অবস্থান নির্ণয়কারী যন্ত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। শুধু যন্ত্র বসালেই হবে না, সেটি সব সময় সচল রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো গণপরিবহনের চলাচল আরও নিরাপদ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করা।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নতুন গাড়ির নিবন্ধন কিংবা ফিটনেস সনদ নবায়নের সময় জিপিএস সংযুক্ত অবস্থায় গাড়ি বিআরটিএতে উপস্থাপন করতে হবে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে গাড়িতে জিপিএস রয়েছে কি না এবং সেটি কার্যকর আছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, নিবন্ধন ও ফিটনেস সংক্রান্ত প্রতিটি প্রক্রিয়ায় জিপিএস সংযুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে গণপরিবহনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে পরিবহন মালিকদের সংগঠন বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের সব গণপরিবহনে একযোগে এই ব্যবস্থা চালু করা বাস্তবে সহজ নয়। সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম খান জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জিপিএস স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু সব যানবাহনে যন্ত্র বসানো এবং তা পুরোপুরি চালু করতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহনের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত গতি, অনিয়মিতভাবে যাত্রী ওঠানামা এবং অনুমোদিত রুটের বাইরে চলাচল নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জিপিএস চালু হলে একটি বাস কোথায় রয়েছে, কত গতিতে চলছে এবং কোন পথে চলাচল করছে—এসব তথ্য সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ফলে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, অনুমোদনহীন রুটে চলাচল কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় কোথাও দাঁড়িয়ে থাকার মতো বিষয়গুলো নজরদারির আওতায় আনা সহজ হবে।
দুর্ঘটনার তদন্তেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি কোথায় ছিল, কত গতিতে চলছিল এবং কোন পথে যাচ্ছিল—এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকলে তদন্ত আরও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং যাত্রীবান্ধব মোবাইল অ্যাপ চালু করা গেলে যাত্রীরা বাসের বর্তমান অবস্থান ও সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময় জানতে পারবেন। এতে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা কমবে, পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে।
বাস মালিকদের জন্যও এই প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে। তারা নিজেদের গাড়ির অবস্থান, চলাচলের রুট, গতি এবং সময় পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এতে বহর পরিচালনা সহজ হবে, জ্বালানির অপচয় কমবে এবং অনুমোদিত রুটের বাইরে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কোনো বাস চুরি বা ছিনতাই হলে দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগও তৈরি হবে।
পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যাচাইয়েও জিপিএসের তথ্য সহায়ক হতে পারে। এছাড়া দুর্ঘটনা, ডাকাতি, হামলা বা যান্ত্রিক ত্রুটির মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু জিপিএস বসিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এই প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য বিশ্লেষণ, আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবহন খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় শুধু জিপিএস সংযুক্ত করেই সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, জিপিএস বাধ্যতামূলক করার এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দুর্ঘটনা কমানো এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতার ওপর।

