মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজন হলে তা আরও তীব্র করা হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল চাপ সৃষ্টি করা নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণ করা এবং ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না দেওয়া।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটন এখনো সামরিক চাপকেই প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় যতটা সম্ভব সংযত থাকার চেষ্টা করছে। তবে তার দাবি, ইরান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সেই বাস্তবতা দেশটিকে একসময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য একটাই—ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ না দেওয়া। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সামরিক অভিযান প্রয়োজন হলে তা অব্যাহত থাকবে। তার ভাষায়, এমন সময় আসবে যখন ইরান আর এই চাপ সহ্য করতে পারবে না।
ইরান এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে—এমন ধারণাও উড়িয়ে দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দেশটি বর্তমানে কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ নয়। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আলোচনার সময় ইরান বারবার অসত্য তথ্য দিচ্ছে, ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি তার আস্থা কমে গেছে।
নিজের বক্তব্যে ট্রাম্প অতীতের কয়েকটি যুদ্ধের উদাহরণও টেনে আনেন। ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি দাবি করেন, মাত্র পাঁচ মাসের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার প্রসঙ্গেও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। ট্রাম্প জানান, বিশেষ দূতের সঙ্গে যোগাযোগের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় তিনি জানতে পারেন, জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরান পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই ঘটনার পর আলোচনার পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও জর্ডানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি কাঠামোগত চুক্তিতে সই করেছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় সেই আশা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়ার পাশাপাশি তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দুই পক্ষের কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা খুব বেশি নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

