মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরবের সম্ভাব্য ভূমিকা। গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে আশঙ্কা—এই যুদ্ধ কি আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে? আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
ইরান ও সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিভাজন—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। যদিও ২০২৩ সালের ১০ মার্চ চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায়, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
গত বছরের জুনে জেনেভায় কূটনৈতিক আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাত শুরু হয়। পরে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আবারও ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হয়, যা টানা কয়েক মাস ধরে চলছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বাইরে থাকতে চেয়েছে। কারণ দেশটির অর্থনীতি, বিশেষ করে তেলশিল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা, বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। কিন্তু বাস্তবতা ক্রমেই তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সৌদি আরব এখন কার্যত তিন দিক থেকে নিরাপত্তা চাপে রয়েছে। একদিকে রয়েছে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা। এসব গোষ্ঠীর হামলা ও হুমকি সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এক ধরনের কৌশলগত দোটানায় পড়েছে। যদি তারা সরাসরি পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালে নিরাপত্তা হুমকি আরও বাড়তে পারে। ফলে রিয়াদের সামনে এখন দুটি কঠিন বিকল্পই খোলা রয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও সৌদি আরবকে উদ্বিগ্ন করছে। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব এলাকায় হামলার কারণে তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের জন্য এটি শুধু নিরাপত্তার নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য অর্থনীতিকে বহুমুখী করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই রিয়াদ এখনো সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলো সম্প্রতি বাহরাইনে যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে। বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতারের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মহড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এটি সরাসরি যুদ্ধ প্রস্তুতি কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি।
এদিকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমে এমন দাবিও এসেছে যে, ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সৌদি আরবেরও অংশগ্রহণ ছিল। তবে এ ধরনের তথ্য নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে এবং সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব তথ্যকে এখনো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করছেন পর্যবেক্ষকরা।
একই সময়ে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোও সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সৌদি আরব আপাতত সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যদি আরও অবনতি ঘটে কিংবা মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সমন্বয় বাড়ে, তাহলে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনাও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে নিজেদের অর্থনীতি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সুরক্ষিত রাখা। সে কারণে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকতে চাইবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিটি সিদ্ধান্তই নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করছে। সৌদি আরব এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, তবে ক্রমবর্ধমান চাপ ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশটির সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের কূটনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর।

