একজন মানুষকে সীমান্ত পার করে তার জন্মভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি কোথায় থাকবেন, কীভাবে জীবিকা চালাবেন, চিকিৎসা পাবেন কি না, সন্তানদের পড়াতে পারবেন কি না কিংবা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়তে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক কঠিন।
আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবাসন ঘিরে বর্তমানে যে আন্তর্জাতিক তৎপরতা চলছে, তার কেন্দ্রীয় দুর্বলতা এখানেই। বিভিন্ন দেশ ধরে নিচ্ছে, আফগানিস্তানে ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন শরণার্থী বা অভিবাসীর সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবে শারীরিকভাবে দেশে ফিরে যাওয়া এবং সেখানে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসিত হওয়া এক বিষয় নয়।
আফগানিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, প্রত্যাবাসন অনেক ক্ষেত্রেই সমাধান না হয়ে নতুন সংকটের সূচনা করছে।
সুরক্ষা থেকে প্রত্যাবাসনের দিকে নীতির মোড়
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঝুঁকিতে থাকা আফগানদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আনুমানিক ১,২৪,০০০ মানুষকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আরও অনেকে আগে থেকেই পাকিস্তান ও ইরানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে বসবাসরত লাখ লাখ আফগানের সঙ্গে যুক্ত হন।
সে সময় আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং জীবন রক্ষা। কিন্তু পাঁচ বছর পর সেই নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন পাকিস্তান, ইরান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আফগানদের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রবণতা জোরদার হয়েছে।
এই নীতিগত পরিবর্তনের পেছনে একটি বড় ধারণা কাজ করছে—আফগানিস্তানে ফিরে গেলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাস্তুচ্যুতি শেষ হয়ে যাবে। অথচ যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অধিকারহীনতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও নিরাপত্তার উদ্বেগ মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, তার অনেকগুলো এখনো বিদ্যমান।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণগুলো বহাল রেখে শুধু মানুষকে আগের স্থানে পাঠিয়ে দেওয়াকে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বলা যায়?
৬০ লাখের বেশি মানুষের প্রত্যাবর্তন
২০২৩ সাল থেকে পাকিস্তান ও ইরান থেকে ৬০ লাখের বেশি আফগান নিজ দেশে ফিরেছেন। কিন্তু এই বিপুল প্রত্যাবর্তনের বড় অংশ স্বেচ্ছায় ঘটেনি।
মিশ্র অভিবাসন কেন্দ্রের জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী আফগান প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশকে বহিষ্কার করা হয়েছিল অথবা দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের অনেকেই চাপ, ভয়, বাধ্যবাধকতা কিংবা সরাসরি জোরপূর্বক ব্যবস্থার মধ্যে আফগানিস্তানে ফিরে গেছেন।
এ ধরনের প্রত্যাবর্তনের মানবিক মূল্য অনেক বড়। অনেকে পেছনে ফেলে এসেছেন পরিবার, বন্ধু, ব্যক্তিগত সম্পদ, চাকরি, ব্যবসা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক। কেউ হয়তো বহু বছর পাকিস্তান বা ইরানে থেকেছেন। তার সন্তানদের জন্ম ও বেড়ে ওঠাও হয়েছে সেখানে। কিন্তু হঠাৎ প্রত্যাবাসনের কারণে পুরো পরিবারকে এমন একটি দেশে ফিরে যেতে হচ্ছে, যেখানে তাদের স্থায়ী ঘর, আয় কিংবা সহায়তার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই।
ফেরত আসা ব্যক্তিদের একটি অংশের কাছে আফগানিস্তান জন্মভূমি হলেও বাস্তব জীবনে দেশটি তাদের জন্য অনেকটাই অপরিচিত। বিশেষ করে যারা শিশু বয়সে দেশ ছেড়েছেন বা বিদেশে জন্মেছেন, তাদের জন্য ফিরে আসা মানে পরিচিত পরিবেশে ফেরা নয়; বরং নতুন করে অনিশ্চিত জীবনে প্রবেশ করা।
ফিরে এসে মাথা গোঁজার জায়গাও নেই
প্রত্যাবাসনকারীদের বড় একটি অংশ আফগানিস্তানে এসে আবাসন, কর্মসংস্থান ও মৌলিক সেবার সংকটে পড়ছেন। কারও থাকার ঘর নেই, কারও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, আবার কারও এমন কোনো সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা নেই যা তাকে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে সাহায্য করতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রায় ৪০ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। অর্ধেকের বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অনুপযুক্ত আবাসনে বসবাস করছেন। অর্থাৎ দেশে পৌঁছানো সম্ভব হলেও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ তাদের অনেকেরই নেই।
এই পরিস্থিতি দেখায়, প্রত্যাবাসনের সাফল্য শুধু কতজন মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছেন, সেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং দেখতে হবে, ফেরার পর তারা জীবন পুনর্গঠন করতে পারছেন কি না।
কেউ দেশে ফিরে যদি গৃহহীন হন, চিকিৎসা না পান, কাজ না পান এবং আবারও দেশ ছাড়ার পথ খুঁজতে বাধ্য হন, তাহলে তার প্রত্যাবাসনকে স্থায়ী সমাধান বলা কঠিন।
ইউরোপেও বাড়ছে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ
আফগানদের প্রত্যাবাসন এখন আর শুধু পাকিস্তান ও ইরানের নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও প্রত্যাবাসন ও পুনরায় গ্রহণের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
জুনের শেষ দিকে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল ব্রাসেলসে যায়। সেখানে ১৫টি ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে আফগানদের প্রত্যাবাসন ও পুনরায় গ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকটি কারিগরি পর্যায়ের বলা হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ আফগানদের ফেরত পাঠানোর জন্য আরও নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি করতে আগ্রহী।
ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমানো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু শুধু নিজ দেশের সীমান্তের ভেতর মানুষের সংখ্যা কমে গেলেই বৃহত্তর মানবিক সংকটের সমাধান হয় না।
একটি দেশ থেকে মানুষকে সরিয়ে অন্য একটি দুর্বল ও সংকটপূর্ণ দেশে পাঠানো হলে সমস্যা শেষ হয় না; সমস্যার অবস্থান বদলে যায়।
প্রত্যাবাসন কতটা স্বেচ্ছামূলক?
আন্তর্জাতিক নীতিতে প্রত্যাবাসনের তিনটি মৌলিক শর্ত গুরুত্বপূর্ণ—তা হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ।
কিন্তু বাস্তবে একজন আফগানকে যদি আটক হওয়ার ভয়, বসবাসের অনুমতি বাতিল, সম্পদ হারানোর ঝুঁকি বা জোরপূর্বক বহিষ্কারের মধ্যে দেশ ছাড়তে হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসনকে স্বেচ্ছামূলক বলা যায় না।
একইভাবে, দেশে ফিরে যদি তিনি রাজনৈতিক পরিচয়, জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, লিঙ্গ বা আগের কর্মকাণ্ডের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, তাহলে প্রত্যাবাসন নিরাপদও নয়।
বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, তালেবান কর্তৃপক্ষের বিরোধী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি, আগের সরকারের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ঝুঁকিতে থাকা পরিবার।
প্রত্যেক প্রত্যাবর্তনকারীর পরিস্থিতি এক নয়। তাই সবাইকে একই নীতির অধীনে ফেরত পাঠানো বাস্তবসম্মত কিংবা ন্যায়সংগত নয়।
মানবিক সহায়তা কমছে, চাপ বাড়ছে
২০২১ সালের আগস্টের পর আফগানিস্তানে সামগ্রিক সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমলেও দেশটি এখনো গভীর মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের অভাব, মৌলিক সেবার সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ হওয়া এবং গত ১৮ মাসে মানবিক তহবিলের বড় অংশ কমে যাওয়ার কারণে সহায়তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে।
এই অবস্থায় লাখ লাখ প্রত্যাবর্তনকারীকে গ্রহণ করা আফগানিস্তানের জন্য অত্যন্ত কঠিন। কারণ দেশটির বিদ্যমান জনগোষ্ঠীরই আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কাজের প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না। এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নতুন প্রত্যাবর্তনকারী যুক্ত হলে সীমিত সম্পদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। প্রত্যাবর্তনকারী নারীদের ৭ শতাংশের কম এবং পুরুষদের মাত্র ৫৯ শতাংশ আয় করার সুযোগ পেয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান শুধু কাজের সংকট দেখায় না; এটি নারী ও পুরুষের মধ্যে সুযোগের বিশাল ব্যবধানও তুলে ধরে।
নারীদের জন্য প্রত্যাবর্তন আরও কঠিন
আফগান নারীদের ক্ষেত্রে দেশে ফেরার সংকট বহুমাত্রিক। তারা শুধু অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখে পড়ছেন না; শিক্ষা, কাজ, চলাচল এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধের মুখোমুখি হচ্ছেন।
২০২১ সালের পর থেকে ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। নারীদের বহু খাতে কাজ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। মাহরাম বা পুরুষ আত্মীয় ছাড়া চলাচলের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়েছে।
ফলে বিদেশ থেকে ফিরে আসা একজন নারী হয়তো এমন একটি পরিবেশে প্রবেশ করছেন, যেখানে তার শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, চাকরি করার অধিকার সীমিত এবং একা সহায়তা সংগ্রহ করাও কঠিন।
সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে আছেন। মোট প্রত্যাবর্তনকারীর ৫৩ শতাংশ দেশে ফেরার পর কোনো সহায়তা পাননি। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৫ শতাংশ।
চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত থাকায় অনেক নারী সহায়তা বিতরণস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। তারা কাজের সন্ধান, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা কিংবা সামাজিক কার্যক্রমেও সহজে অংশ নিতে পারেন না।
জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাদের ক্ষেত্রে লিঙ্গের পাশাপাশি পরিচয়ভিত্তিক ঝুঁকিও যুক্ত হয়।
জরিপে ৬১ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে তাদের জীবন নিয়ে তারা খুব বেশি সন্তুষ্ট নন অথবা তীব্র অসন্তুষ্ট।
এই বাস্তবতায় নারীদের দেশে ফেরত পাঠানোকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় না। এর সঙ্গে শিক্ষা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।
শুধু ফেরানো নয়, পুনর্বাসন দরকার
আফগানিস্তান কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকে দেশটি একাধিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংঘাত এবং ব্যাপক মানবিক দুর্দশা দেখেছে।
২০২৬ সালেও দেশটির পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মৌলিক সেবা, অধিকার সুরক্ষা এবং উন্নয়নমূলক বিনিয়োগের প্রয়োজন আগের মতোই জরুরি।
তাই শুধু মানুষকে আফগানিস্তানে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে অর্থ ব্যয় না করে তাদের পুনর্বাসনের জন্য বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। প্রত্যাবর্তনকারীদের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরির সময় প্রত্যাবর্তনকারী মানুষের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বিশেষ করে নারীদের শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
কারণ যাদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তাদের বাদ দিয়ে কোনো নীতিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে
আফগান প্রত্যাবর্তন সংকটকে শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রতিবেশী দেশ, ইউরোপীয় রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দাতা দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।
আফগান শরণার্থীদের সমাধান কৌশল সহায়তা মঞ্চের উদ্যোগে চলতি বছরের শেষ দিকে আফগান বাস্তুচ্যুতি ও সমাধান নিয়ে একটি আঞ্চলিক সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। এই সম্মেলনে শুধু কতজনকে দেশে ফেরত পাঠানো যাবে, সেই আলোচনা না করে দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
যেসব দেশ বহু বছর আফগান নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের চাপ ও উদ্বেগ বাস্তব। কিন্তু সেই চাপ কমানোর পদ্ধতি এমন হতে পারে না, যাতে দুর্বল মানুষ আরও বড় বিপদের মধ্যে পড়ে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আশ্রয়দাতা দেশগুলোকে সহায়তা, বৈধ বসবাসের সুযোগ, ধাপে ধাপে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তন এবং আফগানিস্তানে কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
সংখ্যার আড়ালে মানুষকে দেখতে হবে
প্রত্যাবাসন নীতিতে প্রায়ই সংখ্যাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখানো হয়। কতজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, কতটি প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়েছে বা কতজন শরণার্থী কমেছে—এসব তথ্য সামনে আসে।
কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার, একটি জীবন এবং একটি ভবিষ্যৎ রয়েছে।
একজন মানুষকে দেশে ফেরত পাঠানোর পর যদি তার সন্তান বিদ্যালয়ে যেতে না পারে, পরিবারের কেউ চিকিৎসা না পায়, কাজের সুযোগ না থাকে কিংবা আবারও পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসন কার্যত ব্যর্থ।
দীর্ঘস্থায়ী সমাধান তখনই সম্ভব, যখন মানুষ নিরাপদে এবং স্বেচ্ছায় ফিরতে পারবেন, বৈষম্য ছাড়া অধিকার ভোগ করবেন এবং নতুন করে জীবন গড়ার বাস্তব সুযোগ পাবেন।
আফগানদের ফেরত পাঠানো কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারে। এতে শরণার্থী ও অভিবাসীর সরকারি সংখ্যা কমতে পারে। কিন্তু শুধু সংখ্যা কমলেই বাস্তুচ্যুতি শেষ হয় না।
নিরাপত্তাহীনতা, অধিকারহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং মৌলিক সেবার সংকট বহাল থাকলে প্রত্যাবাসন সমস্যার সমাধান নয়; বরং সমস্যাটিকে আরও অনিশ্চিত একটি স্থানে সরিয়ে দেওয়া।
আফগানিস্তানের প্রত্যাবর্তন সংকট তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। এটি মানবিক মর্যাদা, নারী অধিকার, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
মানুষকে কোথায় পাঠানো হলো, সেটিই শেষ কথা নয়। সেখানে পৌঁছে তারা কীভাবে বাঁচবে—নীতিনির্ধারকদের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত সেটিই।

