গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের উপকূল আবারও অভিবাসন সংকটের নতুন চিত্র সামনে এনেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক অভিযানে ২০২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে গ্রিসের উপকূলরক্ষী বাহিনী। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি সুদান ও মিসরের নাগরিকও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৭২ জন।
লিবিয়ার উপকূল থেকে নৌকায় করে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন এসব মানুষ। দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ক্রিটের কাছে পৌঁছানোর পর তাঁদের কয়েকটি নৌকা নজরে আসে। এরপর পর্যায়ক্রমে উদ্ধার অভিযান চালায় গ্রিসের কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাগুলো শুধু সমুদ্রপথে অভিবাসনের ঝুঁকিই তুলে ধরছে না, একই সঙ্গে ইউরোপে যাওয়ার আশায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের লিবিয়া-ক্রিট রুট ব্যবহারের প্রবণতাও সামনে আনছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই পথ দিয়ে অভিবাসীদের আগমন বাড়ায় ক্রিটের স্থানীয় প্রশাসনের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট সকালে ক্রিটের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আইয়েরাপেত্রা এলাকার কাছে ৪০ জন অভিবাসী বহনকারী একটি নৌকার সন্ধান পায় ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থার একটি বিমান।
বিষয়টি জানার পর গ্রিসের উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং একটি মাছ ধরার নৌকা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪০ জনকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের আইয়েরাপেত্রা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শুরু হয় পরিচয় শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই।
তবে এর কয়েক ঘণ্টা আগেই আরও দুটি নৌকা থেকে ১১২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রথম নৌকায় ছিলেন ৫৬ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন সুদানের নাগরিক এবং ২৫ জন বাংলাদেশের নাগরিক।
অন্য নৌকাতেও ছিলেন ৫৬ জন। এই দলটিতে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৪৭ জন এবং মিসরের নাগরিক ছিলেন ৯ জন।
এরপর আরও ৪০ জনকে উদ্ধার করা হলে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২০২ জনে।
এই হিসাব থেকেই বোঝা যায়, অল্প সময়ের মধ্যে ক্রিটের উপকূলে কতটা সক্রিয় ছিল অভিবাসন রুটটি। একই সঙ্গে এই পথে বাংলাদেশের নাগরিকদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।
উদ্ধার হওয়া ২০২ জনের মধ্যে ৭২ জন বাংলাদেশি। অর্থাৎ মোট উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশের নাগরিক।
বাংলাদেশিদের একটি অংশ প্রথম নৌকায় এবং বড় একটি অংশ দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। প্রথম নৌকায় ২৫ জন এবং দ্বিতীয় নৌকায় ৪৭ জন বাংলাদেশি ছিলেন। সব মিলিয়ে ৭২ বাংলাদেশির সমুদ্রযাত্রা থেমেছে গ্রিসের উপকূলে এসে।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পেছনে সাধারণত উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের মতো বিষয় কাজ করে। তবে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পরিবর্তে সমুদ্রপথে অনিরাপদ যাত্রা বেছে নিলে এর সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
ক্রিটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ঝুঁকিরই আরেকটি উদাহরণ। নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী, দীর্ঘ সমুদ্রপথ, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং অনিরাপদ যাত্রাপথ—সব মিলিয়ে এ ধরনের যাত্রা যেকোনো সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রিট বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হয়ে উঠেছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা লিবিয়ায় পৌঁছে সেখান থেকে নৌপথে ইউরোপের দিকে যাত্রা করেন। গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ সেই যাত্রাপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
ফলে ক্রিটের দক্ষিণ উপকূলে গ্রিক কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত নজরদারি ও উদ্ধার অভিযান চালাতে হচ্ছে। নতুন করে নৌকা শনাক্ত হলেই উপকূলরক্ষী বাহিনী সেখানে ছুটে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায়ও দেখা গেছে, অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক নৌকার সন্ধান মিলেছে। একটি নৌকায় ৪০ জন এবং তার আগে দুটি নৌকায় ১১২ জন থাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উদ্ধার অভিযানের পরিধি বড় হয়ে যায়।
সমুদ্র থেকে উদ্ধার করার পর অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হলেও তাঁদের পরবর্তী পরিস্থিতি সহজ নয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের হেরাক্লিয়ন বন্দরের একটি অস্থায়ী আবাসনকেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
সেখানে তাঁদের পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণের কাজ চলছে। একই সময়ে ক্রিটে অভিবাসীদের আগমন বাড়তে থাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর তাঁদের সাময়িক আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে উদ্ধার ও সাময়িকভাবে ব্যবস্থাপনা করা স্থানীয় প্রশাসনের জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে একই রুটে যদি নিয়মিতভাবে নতুন নতুন নৌকা আসতে থাকে, তাহলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
ক্রিটের উপকূলে ২০২ জনের উদ্ধার শুধু একটি বিচ্ছিন্ন উদ্ধার অভিযান হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে মানুষের সীমান্ত পেরোনোর প্রবণতা এবং নিরাপদ পথের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহারের বাস্তবতা।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৭২ জনই বাংলাদেশি। ইউরোপে যাওয়ার প্রত্যাশায় বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশ যে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করছেন, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়।
এ ধরনের যাত্রায় অনেক সময় অভিবাসীরা দালালচক্রের ওপর নির্ভর করেন এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। পথে কোনো বিপদ দেখা দিলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য বৈধ কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ যত বাড়বে, অনিরাপদ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা ততটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে মানুষ পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ক্রিটের উপকূলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে ২০২ জনকে উদ্ধারের ঘটনা তাই শুধু গ্রিসের একটি উদ্ধার অভিযান নয়। এটি ইউরোপমুখী অভিবাসনের ক্রমবর্ধমান চাপ, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে যাত্রার ঝুঁকি এবং সেই যাত্রায় বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছে।

