মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ আবার যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে—এমন দাবি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট মঙ্গলবার জানান, রবিবার মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, সমুদ্রে দৃশ্যমান জাহাজ চলাচলের তথ্য এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা, তেলবাহী ট্যাংকারের উপস্থিতি এবং অঞ্চলটির বিকল্প পাইপলাইনের সর্বোচ্চ পরিবহনক্ষমতা বিবেচনায় নিলে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ তেল সরবরাহের কথা বলছে, বাস্তবে সেই পরিমাণ তেল কোথা দিয়ে এবং কীভাবে বের হচ্ছে?
এই প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
হরমুজে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরার দাবি
ক্রিস রাইটের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে।
একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ পাইপলাইন এবং বিকল্প রপ্তানি স্থাপনা ব্যবহার করে হরমুজকে পাশ কাটিয়েও বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে।
রাইটের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়েই দৈনিক প্রায় ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বের হচ্ছে।
এ ছাড়া পাইপলাইন ও বিকল্প পথ দিয়ে প্রতিদিন আরও ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠানো হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এ হিসাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মোট তেল সরবরাহ যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পর্যায়ের খুব কাছাকাছি চলে আসার কথা।
কিন্তু জাহাজ চলাচলের তথ্য সামনে আসার পর এই হিসাব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এক সপ্তাহে মাত্র ৮৪টি জাহাজ
তেলবাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার উপগ্রহচিত্র ও জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী তথ্য ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালির চলাচল পর্যবেক্ষণ করে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ৮৪টি জাহাজ চলাচল করেছে।
এর মধ্যে রবিবার চলেছে মাত্র ৯টি জাহাজ।
যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত।
অর্থাৎ বর্তমান জাহাজ চলাচলের হার এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর হিসাব নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
কারণ দৈনিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে পরিবহন করতে হলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বড় তেলবাহী ট্যাংকার নিয়মিত প্রণালি অতিক্রম করার কথা। কিন্তু দৃশ্যমান জাহাজ চলাচলের সংখ্যায় তার স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
কেপলারের পণ্যবাজার গবেষণা বিভাগের পরিচালক ম্যাট স্মিথের মতে, তারা সমুদ্রে যে চিত্র দেখতে পাচ্ছেন, তার সঙ্গে সরকারি দাবির ব্যবধান সহজে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
জেপি মরগানের হিসাব অনেক কম
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের হিসাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে যে পরিমাণ তেল বের হচ্ছে, তা দৈনিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল নয়।
তাদের হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত প্রবাহ দৈনিক প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর দাবির তুলনায় এই পরিমাণ অর্ধেকেরও কম।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি পর্যায়ে সামরিক নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য থাকতে পারে, যা বেসরকারি জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই।
কিন্তু বিপরীত দিকে, সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা এবং তেল পরিবহন অবকাঠামোর নির্দিষ্ট সীমাও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
ফলে দুই পক্ষের হিসাবের এত বড় পার্থক্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে।
সোমবারের জাহাজ চলাচল আরও বেশি প্রশ্ন তুলেছে
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের সভাপতি অ্যান্ডি লিপোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ৬টি জাহাজ চলাচল করেছে।
এর মধ্যে ৪টি প্রবেশ করেছে এবং ২টি বের হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছয়টির মধ্যে কোনোটিই অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ছিল না।
এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে দৃশ্যমান বাস্তবতার পার্থক্য আরও স্পষ্ট করে।
যদি প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ দিয়ে নিয়মিত বের হয়ে থাকে, তাহলে তেলবাহী বড় জাহাজের উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কথা।
কিন্তু অন্তত পর্যবেক্ষণ করা ওই দিনের চিত্র তেমনটি দেখাচ্ছে না।
বিকল্প পাইপলাইনে অবশ্য বড় পরিমাণ তেল যাচ্ছে
তবে ক্রিস রাইটের সব দাবি নিয়ে একই মাত্রার সন্দেহ নেই।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠানোর যে হিসাব তিনি দিয়েছেন, সেটিকে তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এই পাইপলাইন ব্যবহার করে প্রতিদিন ৫ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল লোহিত সাগরের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।
ইরানের মিত্র হুথিদের পক্ষ থেকে বাব-আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের হুমকি থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্বাভাবিক গতিতেই হয়েছে।
অর্থাৎ বিকল্প রপ্তানি পথ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের সহায়তা করছে।
তবে এখানেও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পাইপলাইনগুলো অসীম পরিমাণ তেল পরিবহন করতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের বিকল্প পাইপলাইন সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করছে।
ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল কম থাকা অবস্থায় শুধু পাইপলাইনের ওপর নির্ভর করে খুব বেশি অতিরিক্ত তেল বিশ্ববাজারে পাঠানোর সুযোগ সীমিত।
রবিবার ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বের হওয়ার দাবি
ক্রিস রাইট আরও বলেছেন, গত এক সপ্তাহে আরব উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বের হয়েছে।
তার দাবি অনুযায়ী, শুধু রবিবারই অঞ্চলটি থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে।
যদি এই হিসাব সঠিক হয়, তবে সেটি যুদ্ধের আগের গড় সরবরাহের চেয়েও বেশি।
কিন্তু এখানেই অবকাঠামোগত প্রশ্নটি আবার সামনে আসে।
একদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে বিকল্প পাইপলাইনও প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলছে।
এই দুই বাস্তবতা মিলিয়ে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানির হিসাব ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তেলের দাম কম রাখতে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা?
জ্বালানি বাজারের কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন শুধু সরবরাহ পরিস্থিতি বর্ণনা করছে না; বাজারের মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলতে চাইছে।
পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে হরমুজের প্রকৃত তেলপ্রবাহ সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো তথ্য পাওয়ার অবস্থানে থাকার কথা।
তারপরও প্রকাশ্যে দেওয়া সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
তার ধারণা, প্রশাসন বাজারে এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে যে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই।
এ ধরনের বার্তা বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক কমাতে পারে এবং তেলের দাম বাড়ার চাপও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
কারণ বাজারে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হলেই ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ সংকটের সম্ভাবনা ধরে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন।
তার বিপরীতে সরকার যদি বারবার জানায় যে সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে, তাহলে বাজারে আতঙ্ক কিছুটা কম থাকতে পারে।
হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই বক্তব্যকে আরও জটিল করে তোলে।
কারণ বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে আনা-নেওয়ার জন্য যদি সামরিক এসকর্ট প্রয়োজন হয়, তাহলে পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা কঠিন।
ইরান হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী ৬৪টি জাহাজে হামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় ১৭ জন নাবিক নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
এই নিরাপত্তাঝুঁকিই অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে হরমুজে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্ক করে তুলেছে।
আর তেল পরিবহনব্যবস্থার জন্য এটি বড় সমস্যা।
কারণ শুধু একদিন কয়েকটি জাহাজ নিরাপদে বের করে আনলেই সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হয় না।
একটি ট্যাংকার তেল নিয়ে বের হলে সেটিকে আবার ফিরে এসে নতুন তেল নিতে হয়। এরপর আবার সেই তেল নিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়।
এই চক্র নিয়মিতভাবে চলতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি তেলপ্রবাহ স্থিতিশীল থাকে না।
সামরিক সহায়তায় একদিনের সাফল্য আর স্বাভাবিক বাজার এক বিষয় নয়
হরমুজে কোনো একটি দিন বা সপ্তাহে জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক সংকেত হতে পারে।
কিন্তু সেটিকে স্থায়ী স্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার আগে কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে।
প্রথমত, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কি নিয়মিত এবং স্বাভাবিকভাবে প্রণালি ব্যবহার করতে পারছে?
দ্বিতীয়ত, প্রতিবার কি সামরিক নিরাপত্তা সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে?
তৃতীয়ত, তেলবাহী ট্যাংকারগুলো কি আবার নিয়মিতভাবে ফিরে এসে নতুন চালান সংগ্রহ করছে?
চতুর্থত, জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানি ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো কি অঞ্চলটিকে আবার গ্রহণযোগ্য ঝুঁকির এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হলে কেবল নির্দিষ্ট কয়েক দিনের প্রবাহ দেখে যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
তেলের দাম প্রত্যাশার তুলনায় কম কেন?
হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও তেলের দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে।
এটি প্রথম দেখায় অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
কারণ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিলে বিশ্ববাজারে মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।
প্রথমত, বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দ্বিতীয়ত, চীন তার বড় আকারের তেল মজুত ব্যবহার করেছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার চাপের একটি অংশ অন্য উৎস ও মজুত থেকে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এই কারণেই সরবরাহে ঐতিহাসিক ধরনের ধাক্কা থাকা সত্ত্বেও বাজারে তেলের দাম আরও বেশি ঊর্ধ্বমুখী হয়নি।
আরেকটি জটিলতা—অদৃশ্য ট্যাংকার
হরমুজ দিয়ে প্রকৃতপক্ষে কত তেল যাচ্ছে, তার সঠিক হিসাব বের করার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় সমস্যা রয়েছে।
সব জাহাজকে স্বাভাবিক উপায়ে অনুসরণ করা যায় না।
শিপিং তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বের হওয়া একটি অংশের তেল তথাকথিত ছায়া বহরের মাধ্যমে পরিবহন করা হচ্ছে।
এই জাহাজগুলোর কিছু নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।
আবার কিছু জাহাজ ভিন্ন পতাকা বা পরিচয় ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেল পরিবহনের তথ্য গোপন করার চেষ্টা করে।
ফলে উপগ্রহ ও জাহাজের সংকেতভিত্তিক তথ্য দিয়ে প্রতিটি চালান শনাক্ত করা সবসময় সম্ভব হয় না।
গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া ৮৪টি জাহাজের মধ্যে ১৭টি ছিল ছায়া বহরের জাহাজ।
এ ছাড়া ১০টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পণ্য বহন করছিল।
ক্রিস রাইট তার তেলপ্রবাহের হিসাবে এসব জাহাজকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন কি না, তা পরিষ্কার নয়।
এই অনিশ্চয়তাও সরকারি এবং বেসরকারি হিসাবের পার্থক্যের একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
তাহলে প্রকৃত পরিস্থিতি কী?
সব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ নেই। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এখনো হরমুজ দিয়ে বের হচ্ছে এবং বিকল্প পাইপলাইনও সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক উৎপাদকরা হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যতটা সম্ভব তেল অন্য পথে পাঠানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে হরমুজে দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল এখনো যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিকতার অনেক নিচে।
গত সপ্তাহের ৮৪টি জাহাজ, রবিবারের ৯টি জাহাজ এবং সোমবারের মাত্র ৬টি জাহাজের তথ্য সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে।
বিশেষ করে সোমবার চলাচল করা জাহাজগুলোর মধ্যে একটিও অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার না থাকা প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দেয়।
ফলে বর্তমানে সবচেয়ে সতর্কভাবে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহব্যবস্থা চাপের মধ্যেও কার্যকর রয়েছে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দৃশ্যমান প্রমাণ এখনো দুর্বল।
সংখ্যার লড়াই আসলে বাজারের আস্থার লড়াই
এই বিতর্ক শুধু কতটি জাহাজ চলল বা প্রতিদিন কত ব্যারেল তেল বের হলো—সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে বিশ্ববাজারের আস্থা।
যুক্তরাষ্ট্র যদি বাজারকে বোঝাতে পারে যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ নিরাপদ এবং পর্যাপ্ত, তাহলে ভবিষ্যৎ ঘাটতির আশঙ্কা কমে যাবে। ফলে তেলের দামের ওপরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে স্বাধীন জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী তথ্য যদি ক্রমাগত দেখায় যে হরমুজে চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম, তাহলে বাজারে ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যাবে।
এ কারণেই এখন শুধু সরকারি ঘোষণার দিকে নয়, নজর রাখতে হবে বাস্তব জাহাজ চলাচল, পাইপলাইনের ব্যবহার, ট্যাংকারের ফিরে আসার হার এবং অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও।
সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
হরমুজের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে আগামী দিনগুলোর জাহাজ চলাচলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে।
যদি নিয়মিতভাবে তেলবাহী ট্যাংকারের সংখ্যা বাড়ে এবং সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমে, তাহলে বলা যাবে পরিস্থিতি সত্যিই স্বাভাবিকতার দিকে যাচ্ছে।
কিন্তু জাহাজ চলাচল যদি সীমিত থাকে এবং পাইপলাইনগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলার পরও অতিরিক্ত রপ্তানির সুযোগ না থাকে, তাহলে সরকারি দাবির সঙ্গে বাস্তব সরবরাহের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এই মুহূর্তে তাই মধ্যপ্রাচ্যের তেলপ্রবাহ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সরবরাহ বন্ধ হয়েছে কি না—সেটি নয়।
বরং প্রশ্ন হলো, সরবরাহ কতটা টেকসই, কতটা নিরাপদ এবং ঘোষিত সংখ্যাগুলো বাস্তব পরিবহন সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল যাচ্ছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। বিকল্প পথেও বিপুল পরিমাণ তেল বের হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফিরে এসেছে কি না, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন।
কারণ তেলের বাজারে একটি দিনের বড় সংখ্যা নয়, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত, নিরাপদ এবং টেকসই সরবরাহ।

