ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে শুধু দুই দেশের সরাসরি সামরিক শক্তির তুলনা দিয়ে বিচার করলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, গোয়েন্দা অবকাঠামো, উপগ্রহনির্ভর নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং বৈশ্বিক সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক রয়েছে। অন্যদিকে ইরান প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। কিন্তু তেহরানের কৌশলও ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রচলিত অর্থে শক্তির প্রতিযোগিতা নয়। ইরানের লক্ষ্য বরং এমন একটি যুদ্ধপরিবেশ তৈরি করা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও দ্রুত ও কম খরচে বিজয় অর্জন করতে না পারে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয়তা এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে চাপ সেই কৌশলের বাস্তব রূপ দেখাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—ইরান কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালাতে পারবে?
এখানে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও স্বার্থে হামলা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা করা এক বিষয় নয়। ইরান ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। জর্ডানসহ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা প্রমাণ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক অবকাঠামো ইরানের জন্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। এমনকি মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় থাকার পরও ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কিন্তু এখান থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না যে ইরান সহজেই ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম। মূল ভূখণ্ডে সরাসরি হামলার জন্য ইরানের প্রয়োজন এমন দূরপাল্লার অস্ত্র, যা আন্তঃমহাদেশীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
২০২৫ সালের মার্কিন সরকারি মূল্যায়ন নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা তখনও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার পর্যায়ে পৌঁছেনি এবং এ ধরনের সক্ষমতা অর্জনে আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় ইরানের সবচেয়ে বড় হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন বাহিনী, ঘাঁটি, মিত্র রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থ।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। কারণ যুদ্ধের আধুনিক বাস্তবতায় কোনো দেশের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে তার ভূখণ্ডে পৌঁছানো সবসময় প্রয়োজন হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির বড় একটি অংশ দেশের বাইরে অবস্থান করে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, নৌবহর, বিমানঘাঁটি, সরবরাহকেন্দ্র এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর অবকাঠামো ইরানের নাগালের তুলনামূলকভাবে অনেক কাছাকাছি। ফলে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, তার জন্য আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর প্রয়োজন নেই। আঞ্চলিক পর্যায়ে মার্কিন সামরিক ব্যয় বাড়ানো, ঘাঁটিগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা, নৌ চলাচল ব্যাহত করা এবং মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই অনেক বেশি বাস্তবসম্মত কৌশল।
ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্ষেপণাস্ত্র নয়, ভৌগোলিক অবস্থান
ইরানের ভূগোল তাকে একটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। দেশটি পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এবং হরমুজ প্রণালীর পাশেই তার দীর্ঘ উপকূল। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর সামরিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা ইরানের রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, সাম্প্রতিক সময়ে সেই চলাচল খুবই সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এখানে ইরানের কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্য প্রান্তে বসে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু সেই শক্তি প্রয়োগের অর্থনৈতিক মূল্যও আছে। হরমুজে অস্থিরতা বাড়লে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়, তেলের দাম বাড়ে, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অর্থাৎ ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে হামলা না করেও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব মার্কিন অর্থনীতি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই কারণেই ইরানের কৌশলকে সরাসরি ‘যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ’ হিসেবে না দেখে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থকে আক্রমণের কৌশল হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি বৈশ্বিক; তাই তার দুর্বলতাও আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।
সময়কে কেন ইরান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে?
ইরান যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চায়, এই ধারণার পেছনে যুক্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বাচনী চক্র দ্বারা পরিচালিত। প্রেসিডেন্টের মেয়াদ, কংগ্রেসের রাজনীতি, জনমত, জ্বালানির দাম, সামরিক ব্যয় এবং মিত্রদের চাপ—সবকিছুই দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইরানের হিসাব হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত সামরিক ফলাফল না পায়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য বাড়বে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্য, হরমুজের অচলাবস্থা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ পুনরায় চালু করতে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
অর্থাৎ ইরানের কাছে যুদ্ধের অর্থ শুধু ‘কতটি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কতদিন একই মাত্রার সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বহন করতে পারবে।
ইরানের মিত্ররা এই সমীকরণকে আরও জটিল করছে
ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো তার আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি এবং ইরাকে বিভিন্ন ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী বহু বছর ধরে তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবের অংশ হিসেবে কাজ করেছে। তবে এই নেটওয়ার্ককে একটি একক সামরিক বাহিনী হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাদের সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা এক নয়।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের ধাক্কায় ইরানের এই নেটওয়ার্কেও পরিবর্তন এসেছে। সিরিয়ায় ইরানের অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহও আগের তুলনায় বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের গুরুত্ব ইরাক ও ইয়েমেনের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি সরে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এর অর্থ হলো, ইরান চাইলে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করেও একাধিক ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইরাক থেকে মার্কিন ঘাঁটি, ইয়েমেন থেকে লোহিত সাগরের নৌপথ এবং ইরান থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল—একাধিক ভৌগোলিক এলাকায় একযোগে সংকট তৈরি যুক্তরাষ্ট্রকে একই সময়ে বহু জায়গায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হচ্ছে।
এটাই ইরানের ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশলের শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি ঘাঁটি রক্ষা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু ইরানের একটি তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও কখনো কখনো প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি মূল্যের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করতে পারে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরির বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কিন্তু এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সুবিধা
ইরানের সক্ষমতা যতই বাড়ুক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক তুলনায় তার সীমাবদ্ধতা বিশাল। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে উন্নত উপগ্রহ নজরদারি, বৈশ্বিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, দূরপাল্লার বিমান, বিমানবাহী রণতরী, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা এবং দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্র একা যুদ্ধ করে না। ন্যাটো মিত্রদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে আধুনিক যুদ্ধবিমান, বিমান প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য প্রচলিত সামরিক সরঞ্জামে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইরান তাই প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানোর চেষ্টা করলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
এ কারণে তেহরানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হলো সরাসরি শক্তির প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যুদ্ধের ধরন পরিবর্তন করা। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সমুদ্রপথের চাপ, সাইবার সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্র এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত—সবগুলোকে একসঙ্গে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে রাজনৈতিকভাবে কম কার্যকর করে তোলা।
ইরান কি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার মাটিতে হামলা করতে পারবে?
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এর উত্তর হবে—সরাসরি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাটি খুব সীমিত; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত হানার সক্ষমতা বাস্তব এবং ইতিমধ্যে তার প্রমাণও স্পষ্ট হয়েছে।
ইরানের হাতে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভিত্তিক সক্ষমতা রয়েছে এবং যুদ্ধের মধ্যেও তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ টিকে থাকার দাবি করা হয়েছে। কিছু মার্কিন ও পশ্চিমা মূল্যায়নেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ টিকে থাকার কথা উঠে এসেছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করার জন্য শুধু শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই হবে না। প্রয়োজন অত্যন্ত দীর্ঘপাল্লার বাহন, নির্ভুল নির্দেশনা, নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং মার্কিন বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ভেদ করার সক্ষমতা। এই জায়গায় ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইরান যদি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অগ্রসর হয়, তার সঙ্গে পারমাণবিক সক্ষমতার সম্ভাবনাও যুক্ত হয় এবং একই সময়ে ড্রোন ও সাইবার সক্ষমতা বাড়তে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকির প্রকৃতি বদলে যেতে পারে। কিন্তু সেটি বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রশ্ন।
সবচেয়ে বড় বিপদ কোথায়?
সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত ইরানের ওয়াশিংটন বা নিউইয়র্কে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নয়। বরং একটি সীমিত আঞ্চলিক যুদ্ধ কীভাবে ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়, সেটিই বেশি উদ্বেগের।
একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বড় হামলা হলে ওয়াশিংটন পাল্টা আঘাত করতে পারে। পাল্টা হামলার পর ইরান আবার উপসাগরীয় স্থাপনা বা সমুদ্রপথে আঘাত করতে পারে। এরপর হুথিরা লোহিত সাগরে হামলা বাড়াতে পারে, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন অবস্থানে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল আরও কমে যেতে পারে। প্রতিটি ধাপ পরবর্তী ধাপকে আরও সম্ভাব্য করে তোলে।
এখানেই দুর্ঘটনাজনিত বড় যুদ্ধের ঝুঁকি। কোনো পক্ষ হয়তো শুরুতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু ধারাবাহিক পাল্টা আঘাতের মাধ্যমে সংঘাত এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা খুবই কঠিন।
আসল লড়াই তাই আমেরিকার মাটিতে নয়
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলা করতে পারবে কি না—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৌশলগতভাবে এটি হয়তো ভুল জায়গায় দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করে। কারণ ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ আমেরিকার মাটিতে পৌঁছানো নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ব্যয়বহুল করে তোলা, মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো।
আর যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি হলো—সে একই সঙ্গে বহু যুদ্ধক্ষেত্রে অভিযান চালানোর ক্ষমতা রাখে, দ্রুত সামরিক শক্তি স্থানান্তর করতে পারে এবং বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদ কাজে লাগাতে পারে। ফলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করার মতো প্রচলিত সামরিক শক্তি না রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয়বহুল, দীর্ঘ এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন যুদ্ধে আটকে রাখার সক্ষমতা রাখে।
এই কারণেই প্রতিবেদনে উঠে আসা ‘সময়কে অস্ত্র বানানো’র ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান জানে, সামরিক শক্তির সরাসরি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। তাই তার সম্ভাব্য কৌশল হলো যুদ্ধের সংজ্ঞাটাই বদলে দেওয়া—যেখানে বিজয় মানে শত্রুর রাজধানী দখল নয়, বরং শত্রুকে এমন ব্যয়ের মধ্যে ফেলা, যাতে একসময় সে নিজেই সংঘাতের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়।
সুতরাং, “ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করতে পারবে?”—এর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তর হলো: আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে প্রচলিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখনো ইরানের বাস্তবসম্মত প্রধান সক্ষমতা নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক স্বার্থ, মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটি, মিত্র, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত করার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে এবং সেটিই বর্তমান সংঘাতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ফরেন রিলেশনস কাউন্সিল, ফ্যাক্টচেক ডট অর্গ, আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন, লে মঁদ, দ্য সুফান সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ও এসিএলইডি।

