সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলাকে কেন্দ্র করে তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক। মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সিরিয়ার কোনো সামরিক ঘাঁটিতে এ ধরনের হামলা হলে সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
এর আগে মঙ্গলবার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। রানওয়ে সংস্কারের কাজ পরিদর্শনে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শন করার পরই হামলা চালানো হয়। ইসরায়েল জানিয়েছে, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকে তারা ভালোভাবে নিচ্ছে না। এ কারণেই হামলা চালানো হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি।
মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক জানান, হামলার আগে তুরস্ককে সতর্ক করা হয়নি। এর প্রতিক্রিয়ায় তুরস্ক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সময়ে সিরিয়ার দারা অঞ্চলের একটি গ্রামের কাছেও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
বারাক বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল, সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি সমন্বয় বা ‘ডিকনফ্লিকশন’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে উত্তেজনা কমানো এবং আরও সংযত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই অগ্রাধিকার।
এর আগে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার খবর প্রকাশের পর গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিলেন বারাক। তিনি ঘটনাটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি কার্যত নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বিষয়ে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি বিদ্যমান অবস্থান বজায় রাখার সমঝোতা ছিল। কিন্তু সিরিয়া আলেপ্পোর কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ দিয়ে সেই অবস্থান প্রায় লঙ্ঘন করেছে।
ইসরায়েলের দাবি, তুরস্কের এ ধরনের সামরিক মোতায়েন তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এবং সিরিয়াকে এ বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সিরিয়া সেই সতর্কতা উপেক্ষা করায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।
রাতে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি বিমান দিয়ে ঘাঁটির রানওয়ে ও সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সিরিয়া এ হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।
রয়টার্সের অনুসারে, সিরিয়ার একটি সামরিক সূত্র এবং স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়।
আবু আল-দুহুর ঘাঁটি সারাকিবের প্রায় ১৭ মাইল পূর্বে অবস্থিত। ইদলিব, হামা ও আলেপ্পো—এই তিন অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে থাকা ঘাঁটিটি উত্তর সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি।
তুরস্কের সহায়তায় বিমানঘাঁটিটির বড় ধরনের সংস্কার এবং সেখানে সম্ভাব্য তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় ইসরায়েলের আকাশ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই হামলাটি চালানো হয়ে থাকতে পারে।
তবে ইসরায়েল তুরস্ক বা সিরিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের আকাশসীমায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে ইসরায়েল।
এ অবস্থায় সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তিন দেশের মধ্যে একটি সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

