আধুনিক যুদ্ধে শুধু বেশি অস্ত্র, বড় যুদ্ধবিমান বা শক্তিশালী নৌবহর থাকলেই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত হয় না। এখন যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রযুক্তি কত দ্রুত তৈরি করা যায়, কত দ্রুত সেটি পরীক্ষা করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কত দ্রুত পরিবর্তন করে সেনাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায়। এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থার সামনে বড় ধরনের একটি সংকট তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রযুক্তি খাত বিশ্বে সবচেয়ে উদ্ভাবনী খাতগুলোর একটি। নতুন সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, মহাকাশ প্রযুক্তি কিংবা উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নতুন উদ্ভাবন সামনে আনছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি সামরিক বাহিনীতে দ্রুত ব্যবহার করার ক্ষেত্রে পেন্টাগনের পুরোনো ক্রয় ও অনুমোদনব্যবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডাগ বেকের বিশ্লেষণে মূল প্রশ্নটি এখানেই—যুক্তরাষ্ট্র কি এমন এক সময়ে পুরোনো সামরিক ক্রয়ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে, যখন যুদ্ধের প্রযুক্তি কয়েক মাস নয়, কখনো কখনো কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বদলে যাচ্ছে?
নতুন ফোন কিনতে পাঁচ বছর অপেক্ষার মতো পরিস্থিতি
সমস্যাটি বোঝাতে একটি সহজ তুলনা করা যায়।
ধরা যাক, কেউ পরিবারের জন্য নতুন আইফোন ১৭ কিনতে গেলেন। কিন্তু কেনার আগে তাকে সেটি দুই থেকে তিন বছর পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই বাজারে আইফোন ১৮ ও ১৯ চলে এল। তারপরও তিনি নতুন মডেল নিতে পারবেন না; যে মডেল দিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছিলেন, সেটিই কিনতে হবে।
এরপর সেই পুরোনো মডেল হাতে পেতেও যদি আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তখন বাজারে আইফোন ২০ ও ২১ চলে আসতে পারে। পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোন পৌঁছাতে আবার আরও এক থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রযুক্তি কেনার অনেক প্রক্রিয়া অনেকটা এমনই বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার প্রয়োজন বলে শনাক্ত করার পর সেটির সমাধান নির্বাচন, পরীক্ষা, অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ এবং বড় পরিসরে কেনার পুরো প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর চলে যেতে পারে। ফলে যখন প্রযুক্তিটি বাস্তবে সামরিক বাহিনীর হাতে পৌঁছায়, তখন বাজারে আরও উন্নত সংস্করণ চলে আসার আশঙ্কা থাকে।
বেসরকারি প্রযুক্তি বাজারে যেখানে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার কারণে পণ্য ও সফটওয়্যার বদলাচ্ছে, সেখানে সামরিক ক্রয়ব্যবস্থা একই গতিতে চলতে না পারলে শুধু অর্থের অপচয় নয়, সরাসরি যুদ্ধক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্র ইতিমধ্যে বদলে গেছে
ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য—সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, যুদ্ধ প্রযুক্তির চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।
ড্রোন এখন শুধু নজরদারির যন্ত্র নয়। তা আক্রমণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, যোগাযোগ, সমুদ্র অভিযান এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
ইউক্রেনের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, দেশটি চলতি বছরে প্রায় ৭০ লাখ ড্রোন উৎপাদন করবে। তাদের ড্রোনের সফটওয়্যার প্রায় প্রতি সপ্তাহে হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং হার্ডওয়্যারে কয়েক সপ্তাহ পরপর পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কোনো নতুন বাধাদান প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তার পাল্টা সমাধান দ্রুত তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে মাত্র প্রায় ৪,০০০ ছোট ড্রোন কিনেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা প্রায় দশ গুণ হয়েছে বলে সরকারি দাবি থাকলেও বিশ্লেষণ অনুযায়ী সেগুলোর অনেকগুলো তুলনামূলক পুরোনো নকশার এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সবসময় তাল মিলিয়ে হালনাগাদ হয়নি।
এই ব্যবধানটি কেবল সংখ্যার নয়। আসল পার্থক্য হলো পরিবর্তনের গতি।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে যে পক্ষ দ্রুত শিখতে পারে, দ্রুত ব্যর্থ হতে পারে, ব্যর্থতা থেকে দ্রুত সংশোধন করতে পারে এবং নতুন সংস্করণ দ্রুত মোতায়েন করতে পারে, তারই বাড়তি সুবিধা তৈরি হয়।
ড্রোন কেনার বড় পরিকল্পনা, কিন্তু বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না—এমন নয়।
ইরানসংক্রান্ত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আরও ড্রোন সংগ্রহের জন্য প্রতিরক্ষা বিভাগ ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ড্রোন আধিপত্য কর্মসূচির আওতায় আগামী দুই বছরে সর্বোচ্চ ৩৪০,০০০ আধুনিক ড্রোন কেনার জন্য কংগ্রেসের কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে এর মধ্যে প্রথম ৩০,০০০ ড্রোনের জন্য চুক্তিও করা হয়েছে।
স্থলবাহিনীর লক্ষ্য আরও বড়। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ড্রোন সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
কাগজে এই সংখ্যা বড়। কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—ড্রোন কেনা আর কার্যকর সামরিক সক্ষমতা তৈরি করা কি একই বিষয়?
উত্তর হলো, না।
ড্রোন কিনে গুদামে রাখলেই সামরিক শক্তি তৈরি হয় না। এগুলো চালানোর প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, প্রতিপক্ষের বাধাদান প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য কৌশলও একই গতিতে গড়ে তুলতে হয়।
ফলে ৩৪০,০০০ বা ১০ লাখ ড্রোনের লক্ষ্য পূরণ করলেও যদি পুরো ব্যবস্থাটি পুরোনো গতিতে চলে, তাহলে সংখ্যার সুবিধা প্রত্যাশিত সামরিক ফল নাও দিতে পারে।
সমস্যার শিকড় ১৯৪৭ সালের ব্যবস্থায়
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক ক্রয়ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৪৭ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিশৃঙ্খল সরকারি কেনাকাটাকে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ করতে কংগ্রেস নতুন আইন প্রণয়ন করে।
১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত হুমকির মুখে দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এই ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনী, প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে বিদায়ী ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার যে সামরিক-শিল্প কাঠামোর প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, পরবর্তী দশকগুলোতে তার অনেক দিক বাস্তবে দৃশ্যমান হয়।
ব্যয় বৃদ্ধি, চুক্তি নিয়ে বিতর্ক এবং প্রতিরক্ষা খাতে নানা কেলেঙ্কারির পর কংগ্রেস আরও কঠোর নিয়ম তৈরি করে।
প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, হিসাব নিরীক্ষা, নথিপত্র সংরক্ষণ, আইন মেনে চলা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং স্বচ্ছতা—এসব উদ্দেশ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সমস্যা হলো, কয়েক দশক ধরে নতুন নতুন বিধি যুক্ত হতে হতে ব্যবস্থা এত জটিল হয়েছে যে এখন অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মানাটাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে; দ্রুত কার্যকর প্রযুক্তি সেনাদের হাতে দেওয়া দ্বিতীয় স্থানে চলে গেছে।
শত পাতার চাহিদাপত্রে কি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ধরা যায়?
পেন্টাগনের আরেকটি সমস্যা শুরু হয় কোনো কিছু কেনার আগেই।
সামরিক প্রয়োজন নির্ধারণ করতে কখনো কখনো শত পাতার বিশদ নথি তৈরি হয়। সেখানে সরকার প্রায় নির্দিষ্ট করে দেয় তারা কী ধরনের পণ্য চায় এবং সেটির বৈশিষ্ট্য কী হবে।
পরিচিত কোনো অস্ত্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি সমস্যাজনক।
কারণ নতুন প্রযুক্তির সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনাটি অনেক সময় ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি নির্মাতারাই আগে বুঝতে পারেন।
২০০৭ সালে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জিজ্ঞেস করা হলে ভবিষ্যতের স্মার্টফোন কেমন হওয়া উচিত, হয়তো অনেকেই আরও দ্রুতগতির পুরোনো ধরনের ফোনের কথাই বলতেন। কিন্তু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন পণ্য তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীরা আগে কল্পনাও করেননি।
সামরিক প্রযুক্তিতেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
পেন্টাগন যদি আগে থেকেই অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে সমাধানের নকশা নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ভালো সমাধান নিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারে।
প্রযুক্তি বদলায় দিনে, অনুমোদন লাগে মাস
বেসরকারি সফটওয়্যার খাতে একটি ছোট ত্রুটি ঠিক করতে দিনে একাধিকবার পরিবর্তন আনা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু সামরিক ব্যবস্থায় ছোট সফটওয়্যার পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একাধিক বৈঠক এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
আর বাজেট ব্যবস্থা আরও বড় সমস্যা তৈরি করে। নির্দিষ্ট পণ্যের নকশা অনেক ক্ষেত্রে অন্তত দুই বছর আগেই অর্থায়ন কাঠামোর মধ্যে আটকে যায়।
এরপর সামরিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং জনবল কাঠামোয় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হতে হতে আরও সময় চলে যায়।
ফলে যখন কোনো প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়, তখন যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ইতিমধ্যে বদলে যেতে পারে।
এখানেই বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
যে যুগে সফটওয়্যারনির্ভর অস্ত্র কয়েক সপ্তাহে পরিবর্তিত হতে পারে, সেখানে দুই বা পাঁচ বছরের সিদ্ধান্তচক্র কৌশলগত ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
ব্যর্থতার ভয়ও বড় বাধা
পেন্টাগনের ক্রয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সবাই অদক্ষ—এমন ধারণাও সঠিক নয়। বরং অনেকেই অত্যন্ত দক্ষ এবং দায়িত্বশীল।
সমস্যাটি প্রণোদনার কাঠামোয়।
কোনো প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে গেলে, ত্রুটি ধরা পড়লে বা সিদ্ধান্ত ভুল হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত কিংবা চাকরিগত ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হন, যেখানে ব্যক্তিগত ঝুঁকি সবচেয়ে কম।
কিন্তু পাঁচ বছর আগে কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেননি এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে সেই প্রযুক্তির অভাবে ক্ষতি হয়েছে—এমন ঘটনার দায় সাধারণত একইভাবে নির্ধারণ করা হয় না।
এর ফল হলো এক ধরনের একমুখী ঝুঁকি।
নতুন কিছু চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু চেষ্টা না করার কারণে ভবিষ্যতে বড় ক্ষতি হলে ব্যক্তিগত দায় তুলনামূলকভাবে কম।
এ অবস্থায় উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
পুরোনো ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরতাও প্রশ্নের মুখে
প্রতিরক্ষা খাতের প্রচলিত বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরে পেন্টাগনের জটিল নিয়ম অনুসারে ব্যবসা করতে করতে নিজেদের কাঠামোও সেই ব্যবস্থার উপযোগী করে তুলেছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ শতাংশ বা তারও বেশি কর্মী আইন, চুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজে যুক্ত থাকতে পারেন। আরও প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মী পেন্টাগনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সামলানোর বিশেষজ্ঞ হতে পারেন।
অন্যদিকে সাধারণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে আইন, বিধি অনুসরণ এবং সরকারি সম্পর্কসংক্রান্ত কর্মীদের হার গড়ে প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ।
নতুন ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা আরও কম।
ফলে কোনো নতুন প্রতিষ্ঠান যদি সামরিক বাজারে প্রবেশ করতে চায়, তাকে শুধু ভালো প্রযুক্তি বানালেই হয় না; বিশাল প্রশাসনিক ব্যবস্থাও বুঝতে হয়।
এতে ছোট ও উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান অনেক সময় শুরুতেই নিরুৎসাহিত হয়।
আর যারা টিকে থাকে, তাদেরও একটি ঝুঁকি থাকে—তারা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেয়ে সরকারি নিয়ম সামলানোর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে।
পরিবর্তনের সূচনা ২০১৫ সালে
এই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যে ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ কার্টার একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন।
উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তি খাত ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি কার্যকর সেতু তৈরি করা।
শুরুটা খুব সহজ ছিল না।
একদিকে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, অন্যদিকে সামরিক কর্মকর্তা—দুই পক্ষের ভাষা, সংস্কৃতি, কাজের গতি ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা ছিল ভিন্ন।
পরবর্তীতে এমন নেতৃত্ব আনা হয় যারা প্রযুক্তি এবং সামরিক প্রয়োজন—দুই জগতই বুঝতেন।
এরপর প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে সক্ষম হয় যে সাধারণ সরকারি ব্যবস্থায় যেখানে নতুন প্রযুক্তি মাঠে আনতে পাঁচ থেকে দশ বছর লেগে যেতে পারে, সেখানে কিছু ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে কার্যকর নমুনা তৈরি করা সম্ভব।
২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শত শত প্রকল্পের ক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের হার ৫০ শতাংশের বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষামূলক প্রযুক্তির অর্ধেকের বেশি সামরিক পক্ষ গ্রহণ করেছিল।
এর মাধ্যমে অভিযান পরিকল্পনার সরঞ্জাম, ড্রোন, ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং মহাকাশ উৎক্ষেপণ সক্ষমতাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সামরিক ব্যবস্থায় আনা হয়।
কিন্তু নতুন সমস্যা দেখা দিল পরের ধাপে।
একটি সফল পরীক্ষামূলক নমুনা যুদ্ধ জেতায় না।
সেটিকে হাজার হাজার সেনার কাছে পৌঁছাতে হয়। বড় পরিসরে উৎপাদন, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হয়।
এই পর্যায়েই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক বাধা আবার সামনে আসে।
২০২৩ সালের পর বড় পরিবর্তন
২০২৩ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন ইউনিটকে আরও উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যান এবং সংস্থাটিকে সরাসরি নিজের কাছে জবাবদিহির কাঠামোয় আনেন।
নতুন কৌশলে পাঁচটি প্রধান দিক গুরুত্ব পায়।
প্রথমত, চার তারকা পর্যায়ের যুদ্ধ পরিচালনাকারী কমান্ডারদের সঙ্গে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত করা হয়, যাতে প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, মহাকাশ বাহিনী, মেরিন বাহিনী এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, প্রতিরক্ষা বিভাগের ২০০টির বেশি উদ্ভাবনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করানোর চেষ্টা করা হয়।
চতুর্থত, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ, মানবসম্পর্কিত প্রযুক্তি, সাইবার সক্ষমতা এবং জ্বালানি প্রযুক্তির মতো খাতে সরাসরি দক্ষতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পঞ্চমত, মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কংগ্রেসও পরে এই সাংগঠনিক পরিবর্তন আইনে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটির বাজেট প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয় এবং অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
এর ফলে একটি প্রযুক্তি প্রথম বছরেই পরীক্ষা করে সীমিত আকারে মাঠে নামানো, দ্বিতীয় বছরে বিস্তার শুরু করা এবং তৃতীয় বছরে বড় পরিসরে ব্যবহারের দিকে যাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়।
সারোনিকের ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই নতুন ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সারোনিক নামের একটি তরুণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নৌবাহিনীর জন্য কম খরচে উন্নত মানের চালকবিহীন সামুদ্রিক যান তৈরির প্রস্তাব আহ্বান করা হয়।
১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এতে সাড়া দেয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরীক্ষামূলক চুক্তি করা হয়। এর মধ্যে সারোনিকও ছিল।
ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির তৈরি নৌযান সামরিক কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদদের কঠোর পরীক্ষা পাস করে।
এরপর নতুন অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে প্রথম ব্যবহারযোগ্য যানগুলো একটি নতুন নৌ স্কোয়াড্রনের জন্য কেনা হয়, যাতে উৎপাদন চলার পাশাপাশি নাবিকরা প্রশিক্ষণ নিতে এবং কৌশল তৈরি করতে পারেন।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নৌবাহিনী সারোনিককে ৩৯২ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি দেয়, যার মাধ্যমে কয়েকশ নৌযান কেনার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৬ সালের মার্চে ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। তখন প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন দাঁড়ায় ৯.২৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষণটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালে ইরানসংক্রান্ত অভিযানে সারোনিকের নৌযান ব্যবহার করা হয়েছে এবং ওমান উপকূলের কাছে আটকে পড়া হেলিকপ্টার চালকদের উদ্ধারেও এগুলো ভূমিকা রেখেছে।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে প্রযুক্তি নির্বাচন, পরীক্ষা, সীমিত মোতায়েন এবং পরে বড় আকারের ক্রয়—সবকিছু অপেক্ষাকৃত দ্রুত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে
বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারেরও কম। কিছু হিসাব অনুযায়ী তা ২ বিলিয়ন ডলারেরও নিচে ছিল।
২০২৫ সালে শুধু প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। সামরিক ও বেসামরিক দুই কাজে ব্যবহারযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো ধরলে তা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাজারে অর্থের ঘাটতি এখন প্রধান বাধা নয়।
নতুন উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে।
মূল প্রশ্ন হচ্ছে—পেন্টাগন কি সেই উদ্ভাবন দ্রুত গ্রহণ করতে পারবে?
পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বাজেটের খুব ছোট অংশে
এত উদ্যোগের পরও সামগ্রিক চিত্র এখনও খুব একটা বদলায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র প্রায় ১ থেকে ৩ শতাংশ প্রকৃত অর্থে নতুন ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে ব্যয় হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন ইউনিটের নিজস্ব বাজেট মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রায় ০.১ শতাংশ।
আর নতুন ধরনের নমনীয় চুক্তির অংশ মোট চুক্তির মাত্র প্রায় ০.৩৩ শতাংশ। নতুন অর্থায়ন প্রতিশ্রুতির হিসাবে এর পরিমাণ ৩ শতাংশের সামান্য কম।
অর্থাৎ সফল কয়েকটি প্রকল্প সংবাদে বড় আলোচনায় এলেও মোট সামরিক ব্যবস্থার বিশাল অংশ এখনও পুরোনো ক্রয়পদ্ধতিতেই চলছে।
এই পরিসংখ্যানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
কারণ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সফল উদ্ভাবন এবং পুরো সামরিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন এক বিষয় নয়।
গবেষণা ও ক্রয় বাজেটের ২০ শতাংশ নিয়ে নতুন প্রস্তাব
বিশ্লেষণে একটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান গবেষণা এবং সরঞ্জাম ক্রয় বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ আলাদা করে প্রতিটি বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সমাধানে ব্যবহারের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, জীবপ্রযুক্তি, মহাকাশ, সাইবার প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন এবং কোয়ান্টাম গণনার মতো ক্ষেত্র থাকতে পারে।
মূল ধারণা হলো, কংগ্রেস প্রতিটি নির্দিষ্ট পণ্যের সংস্করণ ঠিক করে দেওয়ার পরিবর্তে একটি বিস্তৃত প্রযুক্তি খাতের জন্য অর্থ অনুমোদন করবে।
এরপর সামরিক বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী একটি পণ্য থেকে অন্য পণ্যে কিংবা একটি সংস্করণ থেকে নতুন সংস্করণে যেতে পারবে।
তবে এর সঙ্গে কঠোর স্বচ্ছতার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন ইউনিটের মতোই বাহিনীগুলোকে কংগ্রেসকে নিয়মিত জানাতে হবে তারা অর্থ কোথায় ব্যয় করছে, কী ফল পাচ্ছে এবং কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে।
অর্থাৎ স্বাধীনতার বিনিময়ে স্বচ্ছতা।
শুধু ড্রোন নয়, যুদ্ধবিমান ও জাহাজেও প্রযুক্তি দরকার
এই পরিবর্তন শুধু ছোট ড্রোন বা সফটওয়্যারে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত বড় অস্ত্রব্যবস্থার উৎপাদন ব্যয় ও সময়ও বড় সমস্যা।
যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উন্নত সফটওয়্যার, উপাদান এবং উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করে খরচ কমাতে ও গতি বাড়াতে পারে।
এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানের সফটওয়্যার, সাবমেরিন উৎপাদনে নতুন সফটওয়্যার এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে উন্নত কারখানা প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনের কিছু উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও পুরোনো বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতাও প্রয়োজন।
কারণ ছোট প্রতিষ্ঠান নতুন সমাধান তৈরি করতে দ্রুত হলেও বিশাল যুদ্ধবিমান বা জাহাজ কর্মসূচি পরিচালনার অভিজ্ঞতা প্রচলিত বড় প্রতিষ্ঠানের বেশি।
মিত্রদের বাদ দিয়ে প্রযুক্তির লড়াই সম্ভব নয়
প্রযুক্তিগত আধিপত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
আধুনিক প্রযুক্তি সাধারণত এক দেশের মধ্যে পুরোপুরি তৈরি হয় না। সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ, গবেষণা, কাঁচামাল এবং প্রতিভা বিভিন্ন দেশ থেকে আসে।
চীনের বিশাল উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর প্রযুক্তি এবং বাজারের সঙ্গেও কাজ করতে হবে।
মিত্রদের আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যৌথ অভিযানে একই ধরনের যোগাযোগ ও প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে মিত্রদেশের বাজারে এবং মিত্রদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এই সহযোগিতার পথে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড, শুল্ক, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধের কারণে কিছু মিত্র দেশের মধ্যে ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।
দক্ষ লোক নিয়োগেও ধীরগতি
প্রযুক্তি কিনলেই হবে না, প্রযুক্তি বোঝে এমন মানুষও দরকার।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি এবং সামরিক প্রয়োজন—দুই ক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা আছে এমন কর্মী পেন্টাগনের প্রয়োজনের তুলনায় কম।
সমস্যার একটি বড় অংশ নিয়োগব্যবস্থায়।
যোগ্য প্রযুক্তিবিদরা দেশসেবার জন্য বেসরকারি খাতের তুলনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম বেতনেও সরকারি কাজে যোগ দিতে প্রস্তুত হতে পারেন। কিন্তু তাদের যদি চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য ৬ থেকে ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এর সঙ্গে নিরাপত্তা ছাড়পত্রের অতিরিক্ত সময়ও যুক্ত হতে পারে।
ফলে প্রযুক্তি খাত থেকে দক্ষ মানুষ আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে সরকারি নিয়োগব্যবস্থার ধীরগতি বড় প্রতিবন্ধক।
আর যারা সামরিক ব্যবস্থার ভেতরে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করেন, তাদের অনেকেই ভবিষ্যৎ পদোন্নতি ও ক্যারিয়ারের সুযোগ সীমিত মনে করে পরে বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতে চলে যেতে পারেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার মানসিকতায়
পুরো আলোচনার কেন্দ্রে আসলে একটি বিষয়ই রয়েছে—ঝুঁকিকে কীভাবে দেখা হবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যর্থতা এড়ানো অনেক সময় সাফল্য অর্জনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।
কিন্তু উদ্ভাবনের প্রকৃতি ভিন্ন।
নতুন প্রযুক্তির সব পরীক্ষা সফল হবে না।
কিছু প্রকল্প ব্যর্থ হবে। কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি প্রত্যাশা পূরণ করবে না। কিছু বিনিয়োগ নষ্ট হবে।
প্রশ্ন হলো, সেই ব্যর্থতার মূল্য কি নতুন কিছু চেষ্টা না করার মূল্যের চেয়ে বেশি?
যদি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রযুক্তি বদলায়, তাহলে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা করাও এক ধরনের বড় ঝুঁকি।
সুতরাং পেন্টাগনের মূল্যায়ন ও পদোন্নতি ব্যবস্থায় এমন সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে যুক্তিসংগত ঝুঁকি নেওয়াকে শুধু অনুমোদন নয়, প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
প্রযুক্তি খাতকেও বদলাতে হবে
দায় শুধু সরকারের নয়।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এখন এক ধরনের বিনিয়োগের ঢেউ চলছে। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুঝতে হবে, সামরিক বাজারে সবাই টিকবে না।
কিছু খাত—বিশেষ করে সাধারণ আকাশচালিত ড্রোন—ইতিমধ্যে অনেক প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে নতুন কিছু প্রযুক্তিতে এখনও বড় সুযোগ রয়েছে।
পেন্টাগনের একটি কর্মসূচিতে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন পেয়েছে, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছোট ব্যবসা। একই সময়ে ৩০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সুযোগ পায়নি।
এ ধরনের প্রতিযোগিতা প্রযুক্তির স্বাভাবিক অংশ।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সরকারি সহায়তায় বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলে উদ্ভাবনের গতি কমে যেতে পারে।
বরং যে প্রতিষ্ঠান দ্রুত ভালো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে, তাদের বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে; ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও দক্ষ জনবল নতুন উদ্যোগে চলে যেতে দিতে হবে।
চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা শুধু অস্ত্রের সংখ্যার নয়
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের একটি হচ্ছে চীন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার সামরিক বাহিনীকে ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে ২০২৭ সালেই যুদ্ধ হবে।
বরং মূল বিষয় হলো প্রতিরোধক্ষমতা।
যদি চীন মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত প্রযুক্তি মোতায়েন করতে, ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করতে এবং দীর্ঘ যুদ্ধেও উৎপাদন ধরে রাখতে সক্ষম, তাহলে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও কঠিন হবে।
কিন্তু যদি ওয়াশিংটনের নতুন অস্ত্র কেনার প্রতিটি ধাপে কয়েক বছর সময় লাগে, তাহলে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত সুবিধা দ্রুত কমে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সংকটটি অর্থের নয়, সময়ের
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি।
দেশটির বেসরকারি খাতে বিপুল অর্থ, দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগ রয়েছে।
সমস্যা হলো এই সক্ষমতাগুলোকে কত দ্রুত সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে।
পুরোনো ব্যবস্থায় সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত ছিল ধীরে এগোনো, দীর্ঘ পরীক্ষা করা এবং ভুল এড়িয়ে চলা।
কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধে ধীরগতিই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে উঠতে পারে।
পার্ল হারবার, ১১ সেপ্টেম্বর কিংবা করোনা মহামারির মতো বড় সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ব্যবস্থা বদলাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় কোনো বিপর্যয়ের পর পরিবর্তনের অপেক্ষা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে।
বর্তমান প্রশাসন, কংগ্রেস, সামরিক নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তি খাতের সামনে তাই একটি বিরল সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন শুধু নতুন ড্রোন কেনা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা নয়।
প্রশ্ন হলো পুরো ব্যবস্থাটি কি এমনভাবে পুনর্গঠন করা যাবে, যেখানে প্রযুক্তি আবিষ্কার থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর সময় কয়েক বছর থেকে কমিয়ে মাসে আনা সম্ভব হবে।
যদি তা সম্ভব হয়, যুক্তরাষ্ট্র শুধু নতুন অস্ত্রই পাবে না; দ্রুত পরিবর্তনশীল যুদ্ধের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতাও অর্জন করবে।
আর যদি পুরোনো নিয়মই প্রধান হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি খাত পাশে থাকা সত্ত্বেও সামরিক বাহিনী প্রযুক্তির দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে পারে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ তাই শুধু কে বেশি অর্থ ব্যয় করছে, তার ওপর নির্ভর করবে না।
বরং নির্ধারক প্রশ্ন হতে পারে—কে সবচেয়ে দ্রুত শিখছে, বদলাচ্ছে এবং নতুন প্রযুক্তিকে বাস্তব যুদ্ধক্ষমতায় রূপান্তর করছে।

