গাজায় যুদ্ধ থামাতে একের পর এক শান্তিচুক্তি ও পরিকল্পনা সামনে এসেছে। কিন্তু প্রতিবারই কিছুদিন পর সেই উদ্যোগ থমকে গেছে কিংবা ভেঙে পড়েছে। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ জুলাইয়ের শেষ দিকে গাজার জন্য ১৫ দফা একটি রোডম্যাপ প্রকাশ করলেও এর বাস্তবায়ন নিয়েও এখন নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এই চুক্তিগুলো কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে—এর অন্যতম বড় কারণ হলো, কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে সেটি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, বিরোধের মীমাংসা কে করবে এবং কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে আলোচনা বা প্রক্রিয়া কীভাবে আবার শুরু হবে—এসব বিষয়ে আগেই কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়নি।
ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনাতেও বদল এসেছে
জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রকাশিত ট্রাম্পের ১৫ দফা রোডম্যাপে বলা হয়েছিল, হামাস তাদের অস্ত্র একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে। আন্তর্জাতিক একটি যাচাইকারী সংস্থা বিষয়টি অনুমোদন করবে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।
কিন্তু ৯ আগস্ট ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার মিসরের উপকূলে গিয়ে হামাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সেখান থেকে তিনি জেরুজালেমে যান। আলোচনায় অস্ত্র হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রস্তাব আসে—আন্তর্জাতিক কমিটির বদলে একজন মার্কিন জেনারেলের তত্ত্বাবধানে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ যাচাই করার কথা বলা হয়।
এই পরিবর্তনটিই গাজা নিয়ে আগের চুক্তিগুলোর একটি মৌলিক দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে: চুক্তি কার্যকর হয়েছে কি না, সেটি শেষ পর্যন্ত কে নির্ধারণ করবে—এ বিষয়ে শুরুতেই দুই পক্ষের সম্মতি ছিল না।
এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পিস অ্যাগ্রিমেন্ট ডেটাবেস অ্যান্ড ডেটাসেট’-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে গাজা যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত চারটি চুক্তি নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির যুদ্ধবিরতি চুক্তি, অক্টোবরে হওয়া একাধিক যুদ্ধবিরতি ও সংশ্লিষ্ট চুক্তি এবং নভেম্বরে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব ছিল।
জানুয়ারির চুক্তিতে ছিল বিস্তারিত, কিন্তু ছিল না প্রয়োগের কাঠামো
২০২৫ সালের জানুয়ারির চুক্তিটিই চারটির মধ্যে সবচেয়ে বিস্তারিত ছিল। এতে কতজন জিম্মি ও বন্দি বিনিময় হবে, ইসরায়েলি সেনারা কোন কোন পথ দিয়ে গাজা ছাড়বে এবং বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা কীভাবে ও কখন নিজেদের এলাকায় ফিরবেন—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল।
কিন্তু চুক্তির শর্ত কেউ না মানলে তাকে কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারকে চুক্তির গ্যারান্টর করা হলেও তাদের ভূমিকা ছিল মূলত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। চুক্তির পাশাপাশি কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল-থানি একটি ফলোআপ ব্যবস্থা ঘোষণাও করেছিলেন। তবে সেটি চুক্তির মূল অংশে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
গ্যারান্টররা সমস্যা নথিভুক্ত করতে পারতেন, কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করার ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়নি।
এর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায় প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর। ১ মার্চ প্রথম ধাপ শেষ হলেও দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে কোনো সমাধান হয়নি। এরপর ১৮ মার্চ ইসরায়েল আবার গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে।
অক্টোবরে নতুন কাঠামো, কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি সামান্য
২০২৫ সালের অক্টোবরে নতুন করে দুটি চুক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়া সচল করার চেষ্টা করা হয়। ১০ অক্টোবরের চুক্তিতে জানুয়ারির চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থার অভাব—দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ইসরায়েল থেকে পরিচালিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে একটি কেন্দ্র তৈরি করা হয়। এর কাজ ছিল ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করা।
কিন্তু দুই মাস পরও পরিস্থিতিতে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। ত্রাণকর্মী ও জাতিসংঘের কর্মীরা ত্রাণ প্রবেশে বাধা এবং গাজা কে শাসন ও নিরাপত্তা দেবে—সে বিষয়ে আলোচনার অভাব নিয়ে অভিযোগ করেন।
এরপর ১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার ও তুরস্কের নেতারা ‘ট্রাম্প ডিক্লারেশন ফর এনডিউরিং পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ নামে আরেকটি ঘোষণায় সই করেন।
এই ঘোষণায় ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংলাপের মতো বিস্তৃত নীতিতে সম্মতির কথা বলা হয়।
কিন্তু ইসরায়েল ও হামাস কেউই এতে স্বাক্ষর করেনি।
যুদ্ধরত পক্ষগুলো যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে না, সেটি অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় গ্যারান্টর দেশগুলো নিজেরাই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু সমস্যা হলো, যে দুই পক্ষ স্বাক্ষরই করেনি, তাদের হয়ে চারটি সরকার কীভাবে মানবাধিকার ও সহনশীলতার মতো বিষয় নিশ্চিত করবে—চুক্তিতে তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
জাতিসংঘের প্রস্তাবেও রয়ে গেল একই সমস্যা
নভেম্বরে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব গাজা শান্তি প্রক্রিয়ায় আরও বড় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করে।
প্রস্তাবটি ট্রাম্পের ‘কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান টু এন্ড দ্য গাজা কনফ্লিক্ট’ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে এবং গাজার রাজনৈতিক রূপান্তর তদারকির জন্য নতুন একটি অন্তর্বর্তী কাঠামোর প্রধান হিসেবে ‘বোর্ড অব পিস’-কে প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু এই বোর্ডে কারা থাকবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত; চুক্তিতে নারীদের উল্লেখ এসেছে মূলত বন্দি ও জিম্মিদের প্রসঙ্গে।
তবে জাতিসংঘের প্রস্তাব গাজার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। এতে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।
কিন্তু এখানেও মূল সমস্যা থেকে যায়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে তখনই, যখন ১৯৯৪ সালে গাজা ও পশ্চিম তীরের অন্তর্বর্তী প্রশাসন হিসেবে গঠিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার ‘বিশ্বস্ততার সঙ্গে’ বাস্তবায়িত হবে এবং গাজার পুনর্গঠন উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যাবে।
কিন্তু কখন এই সংস্কার যথেষ্ট হয়েছে বা পুনর্গঠন কতটা এগোলে সেই শর্ত পূরণ হয়েছে—তা নির্ধারণের জন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ পরিকল্পনাতেও আবার বদলে গেল শর্ত
এই জায়গাতেই আবার ফিরে আসে ট্রাম্পের ১৫ দফা রোডম্যাপ।
আগের চুক্তিগুলোর তুলনায় এবার কিছু ঘাটতি পূরণের চেষ্টা ছিল। পরিকল্পনায় একটি আন্তর্জাতিক যাচাইকারী কমিটি রাখার কথা বলা হয়েছিল। এর দায়িত্ব ছিল প্রতিটি ধাপ শেষ হওয়ার পর দুই পক্ষই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে কি না, তা নিশ্চিত করা। যাচাই শেষ হলেই পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কথা।
কিন্তু পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত ইতোমধ্যে বদলে গেছে।
রোডম্যাপে ইসরায়েলি সেনাদের ধাপে ধাপে গাজা থেকে প্রত্যাহারের কথা থাকলেও ১৭ আগস্ট ‘বোর্ড অব পিস’ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করে যে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে সরে যাবে না।
শুধু তাই নয়, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ যাচাইয়ের দায়িত্বও বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক কমিটির বদলে একজন মার্কিন জেনারেলের হাতে দেওয়ার কথা উঠেছে।
ফলে আগের চুক্তিগুলোর মতো এবারও প্রশ্ন উঠছে—চুক্তির কোনো পক্ষ শর্ত ভঙ্গ করেছে কি না, সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং সেই সিদ্ধান্ত দুই পক্ষই কীভাবে মেনে নেবে?
টেকসই শান্তির জন্য কী প্রয়োজন?
গাজায় কার্যকর কোনো শান্তিচুক্তি করতে হলে শুধু যুদ্ধবিরতি বা অস্ত্র হস্তান্তরের শর্ত নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। শুরুতেই এমন একজন নিরপেক্ষ সালিশকারী বা মধ্যস্থতাকারী নির্ধারণ করতে হবে, যার সিদ্ধান্ত দুই পক্ষই মেনে নেওয়ার মতো অবস্থানে থাকবে।
একই সঙ্গে চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বিরোধ দেখা দিলে কে তার নিষ্পত্তি করবে এবং ভঙ্গের পর শান্তি প্রক্রিয়া কীভাবে আবার চালু হবে—এসব বিষয়ও চুক্তির শুরুতেই স্পষ্ট থাকতে হবে।
মিসর ও কাতারের মতো আঞ্চলিক গ্যারান্টররা এতদিন গাজা নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই ভবিষ্যতের যেকোনো কার্যকর ব্যবস্থায় তাদেরও আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
তবে শুধু অস্ত্রবিরতি বা নিরস্ত্রীকরণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। গাজা পরিচালনার জন্য এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো দরকার, যেখানে ফিলিস্তিনিদেরও বাস্তব অংশগ্রহণ থাকবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গাজার মানুষকে ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক দিগন্ত দেখাতে হবে—যেখানে যুদ্ধের পর তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তব সম্ভাবনা থাকবে এবং দীর্ঘ যুদ্ধের মানসিক ও সামাজিক ক্ষত মোকাবিলার সুযোগ থাকবে।
কারণ এই রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি না হলে, নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে বিরোধ মিটলেও একই ধরনের অচলাবস্থা আবার ফিরে আসতে পারে।
গাজার শান্তিচুক্তিগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাই শুধু চুক্তির শর্তে নয়; বরং সেই শর্ত বাস্তবায়ন, বিরোধের মীমাংসা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কার্যকর কাঠামোর অনুপস্থিতিতে।

