রাজা হ্যারাল্ড পঞ্চমের মৃত্যুর পর নরওয়ের সিংহাসনে বসেছেন তাঁর ছেলে হাকন অষ্টম। ২৮ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার ৮৯ বছর বয়সে হ্যারাল্ড মারা যাওয়ার পরই সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সিংহাসনের দায়িত্ব নেন ৫৩ বছর বয়সী হাকন।
একই দিন বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের রাজকীয় নাম ঘোষণা করেন এবং বাবার, দাদা ও প্রপিতামহের অনুসরণে ‘Alt for Norge’—‘নরওয়ের জন্য সবকিছু’—মূলমন্ত্র বহাল রাখার কথা জানান।
তবে নতুন রাজার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো তাঁর বাবার মতো মানুষের বিপুল আস্থা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা। হ্যারাল্ড দীর্ঘ ৩৫ বছর নরওয়ের সিংহাসনে ছিলেন এবং দেশটির মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। আধুনিক, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে তিনি ব্যাপক শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর নরওয়ের মানুষ রাজপ্রাসাদের সামনে জড়ো হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
১৯০৫ সালে সুইডেনের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর নরওয়েতে আধুনিক রাজতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। হাকন অষ্টম সেই ধারার অষ্টম হাকন এবং আধুনিক নরওয়ের চতুর্থ রাজা, যিনি হাকন নামটি ধারণ করেছেন। তাঁর আগে রাজা হাকন সপ্তম, রাজা হাকন ষষ্ঠ ও মধ্যযুগের রাজা হাকনদের মধ্যে আরও কয়েকজন এই নাম ব্যবহার করেছেন।
সিংহাসনে বসার পর প্রথম দিকের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই হাকন বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে তিনি নিজের বাবার মৃত্যুর বিষয়টি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান এবং সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন। তাঁর পাশে ছিলেন তাঁর মেয়ে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা, যিনি এখন নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস বা যুবরানি এবং সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করার জন্য হাকন ভালো অবস্থানে আছেন। যুবরাজ থাকার সময় তিনি বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজকীয় দায়িত্ব পালনে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। হ্যারাল্ড অসুস্থ থাকলে কিংবা দেশের বাইরে থাকলে হাকন প্রায়ই রাজার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে বাবার অসুস্থতার সময়ও তিনি রিজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
রাজা হ্যারাল্ড নিজেও ছেলের ওপর আস্থা রাখতেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য কিংস টেলস’-এ তিনি হাকনকে নিজের দায়িত্ব এগিয়ে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত উত্তরসূরি হিসেবে দেখেছিলেন। হ্যারাল্ডের মৃত্যুর পর সেই উত্তরাধিকার এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদ ট্রন্ড নোরেন ইসাকসেনের মতে, হাকন তাঁর বাবার চেয়ে ভিন্ন ধরনের রাজা হবেন। হ্যারাল্ড ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর রসবোধ ছিল অসাধারণ এবং সাধারণ মানুষও সেটি খুব পছন্দ করত। বিপরীতে হাকন তুলনামূলকভাবে শান্ত, সংযত ও কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি মানুষের সঙ্গে আরও খোলামেলা হয়েছেন এবং নিজের রসবোধও বেশি প্রকাশ করেছেন।
ইসাকসেনের মতে, হাকনের ব্যক্তিত্ব গঠনে তাঁর পারিবারিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর বাবা-মায়ের বয়স বেড়েছে এবং স্ত্রী মেতে-মারিত দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। ফলে কয়েক বছর ধরেই পরিবার ও রাজকীয় দায়িত্ব—দুই দিকেই তাঁকে বড় দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে।
১৯৭৩ সালে জন্ম নেওয়া হাকন রাজা হ্যারাল্ড পঞ্চম ও রানি সোনিয়ার সবচেয়ে ছোট সন্তান। তাঁর বড় বোন রাজকুমারী মার্থা লুইস। ১৯৯১ সালে তাঁর দাদা রাজা ওলাভ পঞ্চম মারা গেলে মাত্র ১৭ বছর বয়সে হাকন যুবরাজ হন।
হাকনের মেয়ে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এখন ২২ বছর বয়সী এবং সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী। নরওয়ের সংবিধানে ১৯৯০ সালে উত্তরাধিকার আইনে পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য উত্তরাধিকারের নিয়ম সমান করা হয়। তবে পরিবর্তনটি পূর্ববর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় হাকন তাঁর বড় বোনের আগে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। এখন হাকন রাজা হওয়ায় ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা প্রথম সারির উত্তরাধিকারী হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে নরওয়ের রানি হওয়ার পথে রয়েছেন।
নরওয়ের রাজপরিবারের জন্য কিছুটা অস্থির সময়ে সিংহাসনে বসেছেন হাকন। দেশটির মানুষের মধ্যে রাজতন্ত্র এখনো জনপ্রিয় হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজপরিবার একের পর এক বিতর্কের মুখে পড়েছে। হ্যারাল্ডের দীর্ঘ রাজত্বে রাজপরিবার যে আস্থা তৈরি করেছিল, নতুন রাজার জন্য সেটি ধরে রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিতর্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি হলো হাকনের স্ত্রী মেতে-মারিতের দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁর আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা।
চলতি বছর মেতে-মারিত এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর অতীত যোগাযোগের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ২০২৬ সালে প্রকাশিত নথিতে তাঁদের যোগাযোগের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। পরে তিনি নিজের বিচারবোধ নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকাই ভালো হতো। এ ঘটনায় নরওয়ের রাজপরিবারের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
অন্যদিকে মেতে-মারিতের আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবি ২০২৬ সালের জুনে অসলোর আদালতে ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়। ৪০টি অভিযোগের মধ্যে তিনি ৩৪টিতে দোষী সাব্যস্ত হন, যার মধ্যে দুটি ধর্ষণের অভিযোগও ছিল। দুটি অন্য ধর্ষণের অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। হইবি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
হইবি আনুষ্ঠানিকভাবে নরওয়ের রাজপরিবারের সদস্য নন। তবে তাঁর মা মেতে-মারিত ২০০১ সালে হাকনকে বিয়ে করার পর থেকেই তিনি রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বেড়ে ওঠেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও আদালতের রায় রাজপরিবারের ভাবমূর্তির ওপরও চাপ তৈরি করেছে। মামলার একটি ধর্ষণের ঘটনা রাজপরিবারের স্কাউগুম বাসভবনে ঘটেছিল বলে আদালতের নথিতে উঠে এসেছে।
ছোটবেলায় নিজের রাজপরিবারের পরিচয় মেনে নিতেও হাকনের কিছুটা অস্বস্তি ছিল। ২০২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি ১৯৮০-এর দশকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ের কথা তুলে ধরেন। রাজপরিবারের সদস্য হওয়া নিয়ে স্কুলে কথা বলতে তিনি স্বস্তি বোধ করতেন না এবং বিষয়টি তাঁকে উদ্বিগ্ন করত বলে জানান।
রাজপরিবারের সদস্যদের প্রচলিত শিক্ষার পথ থেকেও হাকনের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যায়। তিনি স্থানীয় সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে নরওয়ের নৌবাহিনীতে কাজ করেন এবং নৌ একাডেমিতে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর তাঁর বাবা ও দাদার মতো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি ক্যাম্পাসে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েন। পরবর্তী সময়ে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসেও পড়াশোনা করেন।
১৯৯৯ সালে নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড শহরে একটি সংগীত উৎসবে হাকনের সঙ্গে মেতে-মারিতের পরিচয় হয়। শহরটি মেতে-মারিতের নিজের শহর। তখন মেতে-মারিত ছিলেন অবিবাহিত একক মা এবং সাধারণ পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি থেকে উঠে আসা একজন নারী। তাঁদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর নরওয়ের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তাঁকে তখন ‘ক্রিস্টিয়ানস্যান্ডের সিন্ডারেলা’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছিল।
২০০১ সালে তাঁদের বিয়ের আগে মেতে-মারিতের অতীত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। তিনি তখন চার বছর বয়সী একটি সন্তানের মা ছিলেন। তাঁর আগের সম্পর্কের সন্তানের বাবা মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে সাজা ভোগ করেছিলেন। একই সময়ে মেতে-মারিতের আগের জীবনযাপন নিয়েও সংবাদমাধ্যমে নানা প্রশ্ন ওঠে।
হাকন অবশ্য সম্পর্ক থেকে সরে আসেননি। বরং তিনি ও তাঁর বাবা হ্যারাল্ড মেতে-মারিতের পাশে দাঁড়ান। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে এমনও আশঙ্কা করা হয়েছিল যে এটি নরওয়ের রাজতন্ত্রের জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সিংহাসন ত্যাগের ঘটনাও তখন আলোচনায় আসে।
তবে নরওয়ের রাজপরিবারে সাধারণ পরিবারের নারীকে বিয়ে করার নজির মেতে-মারিতের আগেই তৈরি হয়েছিল। প্রায় তিন দশক আগে রাজা হ্যারাল্ড নিজেই প্রথা ভেঙে সাধারণ পরিবারের সোনিয়াকে বিয়ে করেছিলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁদের বিয়ে হয় এবং পরে সোনিয়া নরওয়ের রানি হন। হ্যারাল্ডের সেই সিদ্ধান্ত নরওয়ের রাজতন্ত্রকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অসলোতে একটি ফ্ল্যাটে হাকন ও মেতে-মারিতের একসঙ্গে বসবাস নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। রক্ষণশীল নরওয়েজীয় লুথেরান চার্চও বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে সে সময়ের জরিপে দেখা যায়, সাধারণ নরওয়েজীয়দের বড় অংশ এসব বিষয়কে রাজতন্ত্রের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে দেখেননি।
বিয়ের তিন দিন আগে দেওয়া এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে মেতে-মারিত তাঁর ‘উচ্ছৃঙ্খল অতীতের’ জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। তিনি মাদক ব্যবহারেরও নিন্দা করেন। সংবাদমাধ্যমে এর আগে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, ১৯৯০-এর দশকে অসলোতে তিনি যেসব পার্টিতে যেতেন সেখানে মাদক সেবন করা হতো। তবে মেতে-মারিত নিজে মাদক নিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্বীকারোক্তি দেননি।
পরবর্তী সময়ে মেতে-মারিত ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেন। তাঁকে এমন একটি আধুনিক রাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়, যা সময়ের সঙ্গে পুরনো রীতিনীতি বদলাতে পারে। হাকন ও মেতে-মারিতের দুই সন্তান—ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা ও রাজকুমার স্ভেরি ম্যাগনুস।
যুবরানি থাকার সময় মেতে-মারিত বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। এইচআইভিতে আক্রান্ত মানুষের সহায়তা এবং মানুষের পড়াশোনার দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগে তিনি কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, নারী ও অন্যান্য সামাজিক ইস্যুতে কাজ করেছেন এবং জাতিসংঘের এইচআইভি/এইডস কর্মসূচির শুভেচ্ছাদূত ছিলেন।
২০১৮ সালে তাঁর ফুসফুসে গুরুতর রোগ ধরা পড়ার পর তাঁর প্রতি মানুষের সহানুভূতি আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পালমোনারি ফাইব্রোসিসে ভুগছিলেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাঁর ফুসফুস প্রতিস্থাপন সফল হয়েছে বলে রাজপ্রাসাদ জানায়। কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর তিনি বাড়ি ফেরেন এবং আগস্টে হাকনের সঙ্গে তাঁদের ২৫তম বিবাহবার্ষিকীও পালন করেন।
হাকন বলেছেন, মেতে-মারিত তাঁকে নিজের গুটিয়ে থাকা স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছেন। নিজের বিশ্লেষণধর্মী মানসিকতার আবেগগত ভারসাম্য হিসেবেও তিনি স্ত্রীকে বর্ণনা করেছেন। হাকনের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিকভাবে তিনি খুব একটা দক্ষ নন। অন্যদিকে মেতে-মারিত খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন এবং কোনো জায়গায় গিয়ে দ্রুত সবার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাকনের পরিবারকে ঘিরে জনসমক্ষে নজরদারি ও সমালোচনা বেড়েছে। হইবির বিচার ও মেতে-মারিতের এপস্টেইন-যোগাযোগের পাশাপাশি তাঁর গুরুতর অসুস্থতাও পরিবারটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
মেতে-মারিতের এপস্টেইন-যোগাযোগ নিয়ে ২০২৬ সালে প্রকাশিত তথ্যের পর তিনি তাঁর অতীত সম্পর্কের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তাঁর সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তিনি স্বীকার করেন যে তাঁর বিচারবোধ ভালো ছিল না। এ ঘটনায় রাজপরিবারের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যেই হইবির চার বছরের কারাদণ্ড রাজপরিবারের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে। হইবি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ফলে নতুন রাজা হাকনকে শুধু রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্বই নয়, রাজপরিবারের ভাবমূর্তি ও জনআস্থার বিষয়টিও সামলাতে হবে।
রাজপরিবার বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইনকে ঘিরে তৈরি প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে পুরো ঘটনা নিয়ে স্বচ্ছ থাকা। রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে তৈরি হওয়া নানা ধারণা যাতে আরও বড় আকার না নেয়, সে জন্য খোলামেলা অবস্থান প্রয়োজন বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, একটি বা দুটি বিতর্কের প্রভাব দিয়ে নরওয়ের রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে রাজপরিবার এসব সংকট কীভাবে সামলায়। বিশেষ করে হাকন এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে হ্যারাল্ডের দীর্ঘ জীবনে অর্জিত মানুষের আস্থা ধরে রাখেন এবং তা আরও শক্তিশালী করেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।
হাকনের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে কারণ সিংহাসনে বসার সময় তাঁর স্ত্রী সদ্য গুরুতর অস্ত্রোপচার থেকে সেরে উঠছেন। একই সময়ে তাঁর সৎছেলে হইবির মামলার রেশও কাটেনি। ফলে নতুন রাজার দায়িত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক রাজকীয় দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তাঁকে একই সঙ্গে রাজপরিবারের ভাবমূর্তি, মানুষের আস্থা এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ সংকট সামলাতে হবে।
‘নেটঅ্যাভিসেন’-এর রাজপরিবারবিষয়ক প্রতিবেদক তোভে তালেসেনও মনে করেন, সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো হাকনের জন্য কঠিন হবে। তবে তাঁর মতে, হাকন এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত। তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে হাকন তাঁর পূর্বসূরি রাজা হাকন সপ্তম, রাজা ওলাভ পঞ্চম এবং রাজা হ্যারাল্ড পঞ্চমের মতোই মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারবেন।
বাবার দীর্ঘ ও জনপ্রিয় রাজত্বের পর হাকনের সামনে এখন নরওয়ের রাজতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। একদিকে হ্যারাল্ডের রেখে যাওয়া বিপুল জনআস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে স্ত্রী মেতে-মারিতের অসুস্থতা, এপস্টেইন-যোগাযোগের বিতর্ক এবং হইবির মামলার মতো পারিবারিক সংকট—সবকিছু মিলিয়েই তাঁর রাজত্বের শুরুটা কঠিন সময়ে হয়েছে।
তবে যুবরাজ হিসেবে দীর্ঘ প্রস্তুতি, বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং অসুস্থতার সময়ে রাজার প্রতিনিধিত্ব করার কারণে দায়িত্বটি তাঁর জন্য পুরোপুরি নতুন নয়। এখন দেখার বিষয়, হ্যারাল্ডের জনপ্রিয়তা ও আধুনিকতার উত্তরাধিকার ধরে রেখে হাকন কীভাবে নিজের আলাদা রাজকীয় পরিচয় তৈরি করেন এবং নরওয়ের মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করতে পারেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, নরওয়ের রাজপ্রাসাদ ও নরওয়ে সরকারের সরকারি তথ্য।

