২০২৬ সালের বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু বিপুলসংখ্যক সেনা, ট্যাংক কিংবা যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সক্ষমতা নয়, বরং দ্রুত সেনা পাঠানো, ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি, দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কমান্ড ব্যবস্থা এবং একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে একই সঙ্গে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশাল স্থল সামরিক ঘাঁটি- উত্তর ক্যারোলাইনার ফোর্ট লিবার্টি (সাবেক ফোর্ট ব্র্যাগ), কেনটাকি-টেনেসি সীমান্তের ফোর্ট ক্যাম্পবেল এবং টেক্সাসের ফোর্ট ক্যাভাজোস (সাবেক ফোর্ট হুড) বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব ধরে রেখেছে।
তবে তিন ঘাঁটির দায়িত্ব এক নয়। ফোর্ট লিবার্টি মূলত দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এয়ারবোর্ন (Airborne) এবং স্পেশাল অপারেশনস (Special Operations) বাহিনীর কেন্দ্র। ফোর্ট ক্যাম্পবেল এয়ার অ্যাসল্ট (Air Assault) এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বিমান ইউনিটের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। আর ফোর্ট ক্যাভাজোস যুক্তরাষ্ট্রের ভারী সাঁজোয়া বাহিনী, ট্যাংক ও আর্মার্ড কোর (Armored Corps)-এর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বর্তমানে তিনটি ঘাঁটিতেই পুরোনো যুদ্ধকৌশলের সঙ্গে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের অস্ত্রকে একীভূত করার কাজ চলছে।
ফোর্ট লিবার্টি: দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর শক্তি
উত্তর ক্যারোলাইনায় অবস্থিত ফোর্ট লিবার্টি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সামরিক ঘাঁটিগুলোর একটি। ঘাঁটির আয়তন প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ২০০ একর, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার একর প্রশিক্ষণ এলাকার জন্য ব্যবহৃত হয়। ঘাঁটিতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মাইল সড়ক এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটি রয়েছে।
এখানে রয়েছে ১৮তম এয়ারবোর্ন কোর (XVIII Airborne Corps), ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন (82nd Airborne Division) এবং ইউএস আর্মি স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (U.S. Army Special Operations Command)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ড। ফলে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যেকোনো সংকট দেখা দিলে দ্রুত সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে ফোর্ট লিবার্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘাঁটির অফিশিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখানে স্থায়ী, শিক্ষার্থী ও সহায়ক জনবল মিলিয়ে সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি। সামরিক পরিবারের সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, বেসামরিক কর্মী ও ঠিকাদারসহ এই ঘাঁটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মোট জনগোষ্ঠী ২ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি এবং উত্তর ক্যারোলাইনার অর্থনীতিতে ঘাঁটির বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রভাব ১০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে।
বর্তমানে ফোর্ট লিবার্টির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামো আধুনিকায়ন, যেখানে জমে থাকা অবকাঠামোগত ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে ঘাঁটির বিপুল পরিমাণ সড়ক ও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা মেরামতের কাজ চলছে। (উল্লেখ্য, এনডিএএ-এর সুপারিশক্রমে ২০২৩ সালে ফোর্ট ব্র্যাগের নাম পরিবর্তন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফোর্ট লিবার্টি’ রাখা হয়।)

ফোর্ট ক্যাম্পবেল: আকাশপথে দ্রুত আঘাতের সক্ষমতা
কেনটাকি ও টেনেসি সীমান্তে অবস্থিত ফোর্ট ক্যাম্পবেল (Fort Campbell) যুক্তরাষ্ট্রের ১০১তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন- এয়ার অ্যাসল্ট (101st Airborne Division- Air Assault)-এর প্রধান ঘাঁটি। এখানে রয়েছে ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্ট (160th Special Operations Aviation Regiment- ‘নাইট স্টলকার্স’) এবং ৫ম স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপ (5th Special Forces Group)।
প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৭০০ একর আয়তনের এই ঘাঁটিতে প্রায় ২৮ হাজার সক্রিয় সামরিক সদস্যসহ মোট অন-পোস্ট পার্সোনেল জনসংখ্যা ৫৫ হাজারের বেশি।
বর্তমানে এই ঘাঁটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে ফিউচার লং-রেঞ্জ অ্যাসল্ট এয়ারক্রাফট (FLRAA) প্রকল্প। নতুন প্রজন্মের V-280 Valor টিল্টরোটার এয়ারক্রাফট পরিচালনার জন্য ক্যাম্পবেল আর্মি এয়ারফিল্ডে নতুন হ্যাঙ্গার ও আধুনিক অবকাঠামো তৈরির প্রস্তুতি চলছে। এর ফলে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে দ্রুত সৈন্য পরিবহন, শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেদ করে এয়ার অ্যাসল্ট পরিচালনা এবং বিশেষ বাহিনীকে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে।
একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের হেলিকপ্টার, ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন (Counter-Drone) প্রযুক্তি এবং উন্নত নাইট-ভিশন সক্ষমতা একীভূত করার কাজ চলছে।
ফোর্ট ক্যাভাজোস: ট্যাংক যুদ্ধ থেকে ড্রোন প্রতিরোধ
টেক্সাসের বিশাল ফোর্ট ক্যাভাজোস যুক্তরাষ্ট্রের ভারী স্থলবাহিনীর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৬৮ একর (প্রায় ৩৪০ বর্গমাইল) আয়তনের এই ঘাঁটিতে রয়েছে থার্ড আর্মার্ড কোর (III Armored Corps), ফার্স্ট ক্যাভালরি ডিভিশন (1st Cavalry Division) এবং ফার্স্ট আর্মি ডিভিশন ওয়েস্ট (1st Army Division West)। ঘাঁটির অন-পোস্ট জনসংখ্যা ৫১ হাজারের বেশি, যার মধ্যে ৩৪ হাজারের বেশি সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে। (উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে আইনপ্রণেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফোর্ট হুডের নাম পরিবর্তন করে ‘ফোর্ট ক্যাভাজোস’ করা হয়।)
বর্তমানে ফোর্ট ক্যাভাজোসের সামরিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ড্রোন যুদ্ধের কারণে। ফার্স্ট ক্যাভালরি ডিভিশন ‘গোল্ডেন শিল্ড’ (Golden Shield) প্রকল্পের মাধ্যমে সাঁজোয়া বাহিনীর জন্য নতুন কাউন্টার-ইউএএস (Counter-UAS) ব্যবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বিভিন্ন সেন্সর, কাইনেটিক ও নন-কাইনেটিক অস্ত্র ব্যবহার করে ছোট ও মাঝারি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার আধুনিক পদ্ধতি এখানে কার্যকর করা হচ্ছে।
ইউক্রেনসহ সাম্প্রতিক যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে modern tank-গুলো এখন কেবল অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকিতে নেই, বরং এফপিভি ড্রোন (FPV Drone) এবং স্বয়ংক্রিয় আকাশযানের বড় হুমকির মুখোমুখি। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সংস্করণের M1E3 Abrams ট্যাংক প্রজেক্ট এবং সাঁজোয়া ব্রিগেডগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াতে ফোর্ট ক্যাভাজোস ড্রোন, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাঠামো ও ভূমির পরিসংখ্যান
মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেট কাঠামো অনুযায়ী, সেনাসংখ্যা (Total Army End Strength) প্রায় ৯ লাখ ৪৫ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে; যার মধ্যে রেগুলার আর্মি (Regular Army) প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার, আর্মি ন্যাশনাল গার্ড প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার এবং আর্মি রিজার্ভ প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার।
ভূমির দিক থেকে এই তিন ঘাঁটির সম্মিলিত আয়তন প্রায় ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৬৮ একর।
তিন ঘাঁটির মূল সামরিক গুরুত্ব
ফোর্ট লিবার্টি প্রতিনিধিত্ব করছে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও আকাশপথে সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা; ফোর্ট ক্যাম্পবেল প্রতিনিধিত্ব করছে গভীর এয়ার অ্যাসল্ট এবং বিশেষ আকাশ অভিযান; আর ফোর্ট ক্যাভাজোস প্রতিনিধিত্ব করছে ভারী সাঁজোয়া বাহিনী ও আধুনিক স্থলযুদ্ধের সক্ষমতা।
বর্তমানে এই ৩টি ঘাঁটির আধুনিকায়নে সেন্সর, ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেটওয়ার্কভিত্তিক ব্যবহারকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

