বিয়ের আসরে কাবিননামায় লাখ টাকার অঙ্ক লেখা হয়। সবাই তা দেখেন, সই করেন, তারপর কাগজটা তোলা থাকে। অনেক নারী ভাবেন, এই টাকা পাওয়া যাবে হয় তালাকের পর, নয়তো স্বামীর মৃত্যুর পর। হাইকোর্টের একটি নতুন রায় এই ভাবনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
আদালত পরিষ্কার বলেছে, স্ত্রী চাইলে দেনমোহর তখনই দিতে হবে। এর জন্য বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর অপেক্ষা করার দরকার নেই। এই রায় লাখ লাখ নারীর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই রায়টি ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
হাইকোর্ট কী বলেছে
হাইকোর্ট বলেছে, তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্বামীর কাছে স্ত্রীর আদায়যোগ্য পাওনা। এটি অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে। স্ত্রীকে এর জন্য তালাক বা মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতে হবে না।
রায়টির নাম ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন। এটি একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলা। বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর রায় দেন। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়েছে।
যে মামলা থেকে এই রায়
মামলার নথি অনুযায়ী, দম্পতির বিয়ে হয় ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। বিয়ের সময় ২২ লাখ টাকা দেনমোহর ঠিক হয়। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান আছে। নথিতে বলা হয়েছে, স্বামী যৌতুক চাইলে সংসারে অশান্তি শুরু হয়। শেষে বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
এরপর স্ত্রী চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। তিনি দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ চান। স্বামী আদালতে হাজির হননি। ২০২২ সালের ৫ মে আদালত একতরফা ডিক্রি দেন।
ডিক্রিতে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা ধরা হয়। ইদ্দতকালের তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা আসে। মেয়ের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ আসে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। মেয়ের বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশও ছিল।
নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্ট
স্বামী প্রথমে ডিক্রি বাতিলের আবেদন করেন। সেখানে তিনি সফল হননি। পরে আপিল করেন। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট সেই আপিলও খারিজ হয়। একই বছর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন।
হাইকোর্টে স্বামী বলেন, ব্যবসা হারিয়ে তিনি বড় আর্থিক সংকটে আছেন। একসঙ্গে এত টাকা দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি কিস্তিতে টাকা দেওয়ার সুযোগ চান। হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল খারিজ করে দেন।
আদালত স্বামীকে বকেয়া দেনমোহর ও মেয়ের সব বকেয়া ভরণপোষণ দিতে বলেছেন। এভাবেই ডিক্রি কার্যকর করতে হবে। কিস্তির আবেদন আদালত গ্রহণ করেনি।
দেনমোহর কমানোর ক্ষমতা আদালতের নেই
রায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আদালত বলেছেন, দেনমোহরের কোনো অংশ কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হাইকোর্টেরও নেই। শুধু স্ত্রী নিজে ইচ্ছা করলে পুরো বা কিছু অংশ ছেড়ে দিতে পারেন। একে আইনের ভাষায় মওকুফ বলে।
তবে মওকুফ দাবি করলেই হবে না। স্বামীকে প্রমাণ করতে হবে যে স্ত্রী বুঝেশুনে, স্পষ্ট ভাষায় ও স্বাধীনভাবে তা ছেড়েছেন। জবরদস্তি, চাপ, প্রতারণা বা অন্য কোনো উপায়ে সম্মতি আদায় করা হলে সেই মওকুফ বৈধ হবে না।
দেরি করলে ক্ষতিপূরণের সুযোগ
আদালত ক্ষতিপূরণের পথও খুলে দিয়েছেন। স্বামীর টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আছে, তবু তিনি দেরি করছেন। এমন হলে বিচারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলতে পারবেন। অর্থাৎ দেনমোহর আটকে রাখা এখন স্বামীর জন্য ঝুঁকির কাজ।
স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান বিষয়টি সহজ করে বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, মামলা করতে গিয়ে অনেক নারীর খরচ হয়ে যায় দেনমোহরের কয়েক গুণ টাকা। ধরা যাক, দেনমোহর পাঁচ লাখ টাকা। স্বামী পাঁচ বছর হয়রানি করলে আদালত চাইলে ১০ লাখ টাকাও ক্ষতিপূরণ ঠিক করতে পারেন। তিনি মনে করেন, এতে মামলার বদলে মীমাংসার দিকে যাওয়ার চাপ বাড়বে।
মুসলিম পারিবারিক আইন কী বলে?
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ১০ ধারায় একটি পরিষ্কার নিয়ম আছে। কাবিননামায় দেনমোহর কীভাবে দেওয়া হবে তা না লেখা থাকলে পুরো টাকা চাওয়ামাত্র দেয় বলে ধরা হয়। অনেক কাবিননামায় এই অংশ ফাঁকা থাকে। তখন স্ত্রী যেকোনো সময় টাকা চাইতে পারেন।
দেনমোহর আদায়ের মামলা হয় পারিবারিক আদালতে। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর ৫ ধারায় এই এখতিয়ার দেওয়া আছে। আবার মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী নিকাহনামায় দেনমোহরের বিবরণ লিখতে হয়। তাই কাবিননামা এই মামলায় সবচেয়ে বড় দলিল।
তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহর
দেনমোহর সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হলো তাৎক্ষণিক বা মুআজ্জাল, যা বিয়ের পরই চাইলে পাওয়া যায়। আরেকটি হলো বিলম্বিত বা মুয়াজ্জাল, যা প্রচলিত ধারণায় তালাক বা মৃত্যুর পর পাওয়া যায়। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ এই দ্বিতীয় ধারণার ওপরই বড় প্রশ্ন তুলেছে। আদালত বলেছেন, স্ত্রী দাবি করলে বিলম্বিত দেনমোহরও তখনই দিতে হবে।
পাঠকের একটি কথা মনে রাখা দরকার। এটি রায়ের পর্যবেক্ষণ। প্রতিটি মামলায় এর প্রয়োগ কেমন হবে, তা নির্ভর করবে মামলার তথ্য ও কাবিননামার লেখার ওপর। নিজের কাবিননামা নিয়ে সন্দেহ থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে ভাবেন, স্ত্রী নিজে বিচ্ছেদ চাইলে দেনমোহর বাতিল হয়ে যায়। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ এর ৫ ধারা বলছে, এই আইনে বিচ্ছেদ হলেও স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না। সময় পার হয়ে গেলেও এই পাওনা মুছে যায় না।
২০১২ সালে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি লেখায় একটি গবেষণার কথা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ নারী কখনো দেনমোহর দাবিই করেন না। এই তথ্য পুরোনো। তবু এটি দেখায়, অধিকার জানা আর অধিকার চাওয়ার মধ্যে অনেক দূরত্ব।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
কোরআনে সুরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, নারীদের মোহর খুশিমনে দিয়ে দাও। এখানে মোহরকে স্ত্রীর নিজস্ব হক বলা হয়েছে। এটি স্বামীর দয়া বা উপহার নয়। এটি বিয়ে থেকে তৈরি হওয়া একটি দায়িত্ব।
একই সুরার ২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, স্ত্রীকে অনেক সম্পদ দিলেও তা ফেরত নেওয়া যাবে না। সুরা বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াতেও একই কথা আছে। সুরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতেই আছে, স্ত্রী নিজে খুশি হয়ে কিছু ছেড়ে দিলে স্বামী তা ভোগ করতে পারেন। হাইকোর্টের রায়ের মওকুফের নিয়মের সঙ্গে এর মিল স্পষ্ট। সেখানেও শর্ত হলো স্ত্রীর স্বাধীন ইচ্ছা।
হাদিসেও মোহরের গুরুত্ব পাওয়া যায়। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আছে, রাসুল (সা.) বিয়ে করতে চাওয়া এক সাহাবিকে মোহর দিতে বলেছিলেন। সাহাবির হাতে কিছু ছিল না। তখনও রাসুল (সা.) বলেছিলেন, লোহার একটি আংটি হলেও খুঁজে আনো। এ থেকে বোঝা যায়, বিয়েতে মোহর ছাড়া চলে না।
নারীদের করণীয়
বিয়ের সময় কাবিননামার দেনমোহরের ঘর ভালো করে পড়ুন। অংশ ফাঁকা রাখলে আইনে পুরোটাই চাহিদামতো দেয় ধরা হয়। নিজের কাবিননামার একটি কপি সবসময় নিজের কাছে রাখুন।
চাপে পড়ে মওকুফের কাগজে সই করবেন না। দরকার হলে লিখিতভাবে দাবি জানান। তাতেও না হলে পারিবারিক আদালতে মামলা করুন।
হাইকোর্টের এই রায় একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার, আর এই অধিকার আটকে রাখা যাবে না। দেরি করলে স্বামীকে শুধু টাকা নয়, ক্ষতিপূরণও দিতে হতে পারে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি ও কাবিননামার ধারা মিলিয়ে দেখলে নারীরা নিজের অবস্থান আরও ভালো বুঝতে পারবেন।

