ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো থামেনি। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান কোনো সাফল্য আনতে পারেনি। তারপরও মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
সম্প্রতি দুটি ঘটনা সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। একদিকে বিরল এক সফরে মস্কো গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। অন্যদিকে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন রুশ অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ।
দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের এই যোগাযোগকে অনেকেই ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখনই একে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রমাণ বলা যাবে না। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্যও কাটেনি।
তাহলে হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ কেন বাড়ছে? আর এর প্রভাবই বা কী হতে পারে?
মস্কোয় সিআইএ প্রধানের বিরল সফর
সাম্প্রতিক যোগাযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের মস্কো সফর। গত সপ্তাহে সেখানে তিনি রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে র্যাটক্লিফের সঙ্গে দেখা করেননি।
ট্রাম্প এই সফরকে খুব একটা অস্বাভাবিক হিসেবে দেখাতে চাননি। তিনি একে ‘আংশিকভাবে নিয়মিত’ ধরনের যোগাযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান, এর সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার সম্পর্ক রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় রাশিয়ার সম্ভাব্যভাবে কোনো ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্রে হামলা চালানোর ঝুঁকি এবং ইরানের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ তুলে ধরেছিলেন র্যাটক্লিফ।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ক্ষমতায় ফিরলে তিনি ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে’ ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত তিনি কোনো শান্তিচুক্তি করাতে পারেননি।
তারপরও ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে উত্তেজনাকে প্রকাশ্যে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি ট্রাম্পকে। র্যাটক্লিফের সফরের পর তিনি বলেন, মস্কোয় ‘ভালো আলোচনা’ হয়েছে এবং রাশিয়া ন্যাটো ভূখণ্ডে হামলা করবে বলে তিনি মনে করেন না।
তবু ইউরোপকে ঘিরে উত্তেজনা কমেনি
ট্রাম্পের আশাবাদী বক্তব্যের বিপরীতে ইউরোপকে ঘিরে রাশিয়ার বক্তব্য এখনো বেশ কঠোর।
সম্প্রতি মস্কো সতর্ক করেছে, ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহ করার কারণে যুক্তরাজ্যকে ‘পরিণতি’ ভোগ করতে হতে পারে। এসব ড্রোনের কিছু রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ মস্কোর।
লন্ডনে রুশ দূতাবাস বলেছে, সংঘাতে যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততা যত বাড়বে, তাদের জন্য মূল্যও তত বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবিশ্বাস যে কমেছে—এমনটা বলার সুযোগ এখনো নেই।
জি২০ বৈঠকে রুশ অর্থমন্ত্রীর ‘চমক’
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় অনুষ্ঠিত জি২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে।
সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হন রুশ অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ শুরুর পর এই প্রথম তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এ ধরনের জি২০ বৈঠকে অংশ নিলেন।
বৈঠকের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
তবে বার্তা ছিল স্পষ্ট—যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার জন্য কোনো আর্থিক চুক্তি বা অর্থনৈতিক ছাড়ের সম্ভাবনা নেই। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় বেসেন্ট রুশ পক্ষকে এ অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
ফলে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হলেও ওয়াশিংটন এখনই মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে দেওয়ার পথে যাচ্ছে না।
শান্তি আলোচনা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে?
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।
এর প্রধান কারণ ভূখণ্ড নিয়ে দুই পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান।
রাশিয়া চায়, পূর্ব ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর মস্কোর দাবি মেনে নিক কিয়েভ। অন্যদিকে ইউক্রেন পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো ভূখণ্ড স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে তারা রাজি নয়।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, সেটিও মূলত মস্কোর ভূখণ্ড-সংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করেই অচল হয়ে পড়ে।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইউক্রেনের শীর্ষ প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টা কিরিলো বুদানভ গত সপ্তাহে বলেছেন, ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নতুন আলোচনা ‘খুব শিগগিরই’ শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে তাঁর ‘বিস্তারিত ও গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য ইউক্রেন সফর এবং শান্তিপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার উপায় ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়।
আলোচনা চলছে, যুদ্ধও চলছে
কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বদলায়নি।
রাশিয়া ও ইউক্রেন এখনো একে অপরের জ্বালানি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলেও চলছে তীব্র লড়াই।
মঙ্গলবার কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রুশ বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এটি ছিল ইউক্রেনের রাজধানীতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বড় ধরনের রুশ হামলা।
অন্যদিকে জেলেনস্কির নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক কমিশনার ভ্লাদিস্লাভ ভ্লাসিউকও যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, আলোচনার দরজা কিছুটা খুললেও যুদ্ধক্ষেত্রে এখনো তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক সত্যিই বদলাচ্ছে?
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনরায় চালুর উদ্যোগ দেখা গেছে।
ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন ও মস্কো দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা পুনরায় চালু করতে সম্মত হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে এই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল ইউরোপের অনেক দেশ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির সহযোগী ফেলো কিয়ার জাইলস মনে করেন, ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া গেলে তা উদ্বেগ আরও বাড়াবে।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়াকে প্রতিপক্ষের পরিবর্তে অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে মস্কোর সরাসরি হুমকির মুখে থাকা দেশগুলো। এর মধ্যে শুধু ইউক্রেন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররাও রয়েছে।
ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা
সমালোচকদের আশঙ্কা, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলে রাশিয়া ন্যাটোর বিরুদ্ধে আরও সাহসী অবস্থান নিতে পারে।
সাবেক রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই ফেদোরভ আগস্টে বিবিসিকে বলেন, রাশিয়ার অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন, যুক্তরাজ্যের ওপর কোনো রুশ হামলা হলে ন্যাটো হয়তো শক্তভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে না।
তাঁর দাবি ছিল, ট্রাম্প ন্যাটোকে বড় ধরনের জবাব দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেন।
এ ধরনের বক্তব্য বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইউরোপের আপত্তি
জি২০ বৈঠকে রাশিয়ার উপস্থিতিও ইউরোপের কয়েকটি দেশের অসন্তোষের কারণ হয়েছে।
পোল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রেজ ডোমানস্কি বলেছেন, তিনি মস্কোর প্রতিনিধিকে জি২০ বৈঠকে দেখে খুশি হননি। তাঁর ভাষায়, রাশিয়ার ওপর বিশ্বাস রাখা যায় না এবং তাদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতিবিষয়ক প্রধান ভালদিস ডোমব্রোভস্কিসও বলেছেন, জি২০-তে রাশিয়ার অংশগ্রহণকে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলার জন্য বর্তমান সময় উপযুক্ত নয়।
যোগাযোগ বাড়ছে, কিন্তু দূরত্ব এখনো অনেক
সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যে মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চাইছে, তার বেশ কিছু স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। সিআইএ পরিচালকের সফর, রুশ অর্থমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে জি২০ বৈঠকে অংশগ্রহণ এবং সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ পুনরায় চালুর উদ্যোগ—সবই সেই পরিবর্তনের অংশ।
কিন্তু এটিকে এখনই যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক পুনরুদ্ধার বলা কঠিন।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে, ভূখণ্ড নিয়ে সমঝোতা হয়নি এবং ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারণার বিরোধিতা করছে।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত ওয়াশিংটন ও মস্কো আবার কথা বলছে কি না—সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই নতুন যোগাযোগ কি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে সাহায্য করবে, নাকি রাশিয়ার প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের নীতিতে আরও বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে।

