রয়টার্স
দেশটির প্রাক্তন একজন আমলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক প্রধান এই প্রবৃদ্ধির হিসাব বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ভারতের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে এক বড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির প্রাক্তন একজন আমলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক প্রধান এই প্রবৃদ্ধির হিসাব বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অপরদিকে সরকার তাদের দেওয়া পরিসংখ্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সোমবারে প্রকাশিত সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম এই অর্থনীতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এটি রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকদের দেওয়া ৭ দশমিক ১ শতাংশের পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে গেছে, যার পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন খাতের শক্তি এবং সুদৃঢ় অভ্যন্তরীণ চাহিদা।
আসল বিতর্ক যেখানে
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক শীর্ষ আমলা সুভাষ চন্দ্র গার্গ ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেন, এই প্রবৃদ্ধির হিসাবটি কিছুটা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। কারণ, মূল তুলনার ভিত্তি হিসেবে সরকার আগের বছরের একই সময়ের জিডিপির পরিমাপ কমিয়ে ধরেছিল। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজন প্রশ্ন তুলেছেন, জিডিপির এই জোরালো প্রবৃদ্ধির অঙ্কটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগের শক্তিশালী চিত্রে কেন প্রতিফলিত হচ্ছে না?
কিছু বেসরকারি অর্থনীতিবিদও ‘ডিফ্লেটর’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বের করার জন্য ‘নামমাত্র জিডিপি’ থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিতে এই সূচকটি ব্যবহার করা হয়। তাদের মতে, অন্যান্য মূল্যসূচকের তুলনায় এটি মূল্যস্ফীতিকে কম করে দেখিয়েছে। শুরুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হওয়া এই বিতর্ককে লুফে নিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের সমালোচনা শুরু করেছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এই ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে “পরিসংখ্যানের কারসাজি” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং সুযোগ ও চাকরির অভাবজনিত ক্ষোভ থেকে গত জুলাইয়ে তরুণদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এ ঘটনার পর থেকেই মোদি সরকার এক ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
সরকারের বক্তব্য
ভারতের পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় সুভাষ চন্দ্র গার্গের সমালোচনার জবাব দেওয়ার জন্য বুধবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনের আহ্বান জানায়। উল্লেখ্য, গার্গ ২০২৫ সালে ‘নো, মিনিস্টার’ নামে একটি বই লিখেছেন, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরা হয়। পরিসংখ্যান দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জিডিপির তথ্য গণনায় সরকারের পরিবর্তনগুলোর পক্ষে বলেন, ফেব্রুয়ারিতে চালুকৃত এই পদ্ধতির পরিবর্তনটি ব্যাপক আলোচনার পরেই নেওয়া হয়েছিল।
সরকারের মতে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও নির্ভুলভাবে প্রতিফলিত করার জন্য এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন ডেটা সিরিজ গ্রহণের ফলে ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকের নামমাত্র জিডিপি পুরোনো সিরিজের ৮৬.০৫ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে কমে ৮০ ট্রিলিয়ন রুপি (৮৫০ বিলিয়ন ডলার) হয়। যদি সোমবার প্রকাশিত জিডিপির তথ্যে পুরোনো ভিত্তি ব্যবহার করা হতো, তবে সরকারের জানানো ১০ দশমিক ৩ শতাংশের বদলে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি হতো মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে সরকার বলছে, এই দুটির সরাসরি তুলনা করা যৌক্তিক বা সমকক্ষ নয়। ফেব্রুয়ারির পরিবর্তনটি কেবল এক দশকেরও বেশি পুরোনো ভিত্তি বছরকে হালনাগাদ করেনি, এটি উপাত্তের উৎস এবং অন্তর্ভূক্ত পণ্য ও সেবাগুলোকেও পরিমার্জিত করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে পরিসংখ্যান সচিব সাংবাদিকদের জানান, গত তিন বছরে ত্রৈমাসিক সংশোধনে প্রবৃদ্ধির অঙ্ক বাড়া-কমা উভয় দিকেই হয়েছে, তবে বার্ষিক ভিত্তিতে এই পরিবর্তনগুলো তুলনামূলকভাবে সামান্য ছিল। মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে, সরকারের এপ্রিল-জুন ট্রাইমাসিকের ‘ডিফ্লেটর’ ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ৪ শতাংশের বেশি খুচরা মূল্যস্ফীতি এবং ৯ শতাংশের বেশি পাইকারি মূল্যস্ফীতির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সরকারের দাবি, নতুন এই পরিমাপ পদ্ধতিটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ডাবল ডিফ্লেশন’ পদ্ধতি অনুসরণ করে—যেখানে পণ্যের উৎপাদন মূল্য এবং উপকরণের খরচ—উভয়কেই আলাদাভাবে মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করা হয়। পরিসংখ্যান সচিব জানান, নতুন জিডিপি সিরিজে আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত ‘প্রডিউসার প্রাইস ইনডেক্স’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে উপকরণের জন্য আগে যেখানে ১৮০টি ডিফ্লেটর ছিল, তা বাড়িয়ে ৩০০টিরও বেশি করা হয়েছে।
ভারতের পরিসংখ্যান মিলছে কি না
ভারতের অর্থনীতির শক্তি নির্দেশকারী অন্যান্য ঘনঘন পরিবর্তিত সূচকগুলোর সাথে এই জিডিপির উপাত্তের সামঞ্জস্য রয়েছে। আগস্ট মাসে গাড়ি বিক্রি ২১ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি পৌঁছেছে ১৯ শতাংশে, যা এক দশকের সর্বোচ্চ। এছাড়া এপ্রিল-আগস্ট মেয়াদে ভারতের নিট প্রত্যক্ষ কর রাজস্ব বছরে বছরে ২৩ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এর বিপরীতে, জরিপভিত্তিক সূচক ‘পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স’ (পিএমআই) কমে গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।
ডিফ্লেটরের বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা দ্বিধাবিভক্ত। মুম্বাইভিত্তিক ‘আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজ প্রাইমারি ডিলারশিপ’ জানিয়েছে, ডিফ্লেটরটি পাইকারি ও খুচরা মূল্যস্ফীতির নিচে থাকলেও তা যৌক্তিক; কারণ প্রস্তুতকৃত পণ্যের মূল্যের চেয়ে উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম দ্রুত বাড়ছে। তবে ‘সোসিয়েত জেনারেল’-এর অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিফ্লেটরের এই নিচু হার প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

