পাকিস্তানের হাতে আটক হওয়া অভিনন্দন বর্তমান নামের সেই পাইলট ভারতীয় বিমানবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১৯ সালে হামলা চালাতে গিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে ভূপাতিত হয়েছিল ভারতীয় এই পাইলটের যুদ্ধবিমান। পরে তাকে আটক করে পাকিস্তানি সেনারা।
সেই ঘটনার তিনদিনের মাথায় মুক্তি পাওয়া অভিনন্দন এবার যুদ্ধবিমান ছেড়ে যাত্রীবাহী বিমান চালাবেন। ভারতীয় বিমানবাহিনী থেকে আগাম অবসর নিয়ে তিনি বেসরকারি এয়ারলাইনস ফ্লাই৯১-এ বাণিজ্যিক পাইলট হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, পাকিস্তানে হামলা চালাতে গিয়ে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর আটক হওয়া পাইলট অভিনন্দন বর্তমান ভারতীয় বিমানবাহিনী থেকে আগাম অবসর নিয়ে বাণিজ্যিক পাইলট হিসেবে নতুন করে বিমান চলাচল ক্যারিয়ার শুরু করেছেন।
বেশ কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, সাবেক গ্রুপ ক্যাপ্টেন ও বীর চক্র পদকপ্রাপ্ত অভিনন্দন বর্তমান বিমানবাহিনীতে ২২ বছর দায়িত্ব পালনের পর গোয়াভিত্তিক আঞ্চলিক এয়ারলাইনস ফ্লাই৯১-এ পাইলট হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিনন্দন গত আগস্ট মাসে বেসরকারি এই এয়ারলাইনসে যোগ দেন। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত অভিনন্দন বর্তমান কোনও বক্তব্য দেননি। ফ্লাই৯১-এর একজন মুখপাত্রও কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি ব্যক্তিগত বিষয়।
২০২৪ সালের মার্চে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা ফ্লাই৯১ বর্তমানে ছয়টি এটিআর ৭২-৬০০ উড়োজাহাজ নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এয়ারলাইনসটির দুটি ঘাঁটি হলো গোয়া ও হায়দরাবাদ।
পুলওয়ামা হামলা থেকে বালাকোট
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতশাসিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর গাড়িবহরে আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৪২ জন জওয়ান নিহত হন। ভারত এই ঘটনায় পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনকে দায়ী করে।
পুলওয়ামা হামলার জবাব দিতেই পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে হামলা চালায় ভারত। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হামলায় অন্তত ৩০০ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান জানায়, হামলায় কিছু গাছের ক্ষতি হওয়া ছাড়া কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
মূলত পুলওয়ামায় হামলার ১২ দিনের মাথায় মিরাজ ২০০০ যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে আকাশপথে পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা চালায় ভারতীয় বিমান বাহিনী। এরপর আকাশপথে ভারতকে আক্রমণ করে পাকিস্তান। ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে ধাওয়া করে পাকিস্তানের এফ-১৬ বিমান সেটি গুলি করে ভূপাতিত করে এবং ভারতীয় বিমানটির পাইলট উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে বন্দি করে।
ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করা পাকিস্তানি পাইলটরা
ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করা দুই পাইলট ছিলেন উইং কমান্ডার নোমান আলী খান এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফাহিম আহমেদ খান। এর মধ্যে উইং কমান্ডার নোমান আলী খানকে সিতারা-ই-জুরাত (বীরত্বের তারকা) এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফাহিম আহমেদ খান ও স্কয়ার লেডার হাসান মাহমুদ সিদ্দিকীকে তমঘা-ই-জুরাত (বীরত্বের পদক) প্রদান করা হয়েছিল।
মূলত ভারতের ‘বালাকোট স্ট্রাইক’-এর জবাবে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পাল্টা হামলা পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত ভারত ও পাকিস্তানকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিল। মূলত ভারতীয় সামরিক বিমান পাকিস্তানশাসিত আজাদ কাশ্মিরের মুজাফফরাবাদ সেক্টরের কাছে নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) লঙ্ঘন করার পরই এই সংঘাত হয়েছিল।
আলোচনার কেন্দ্রে অভিনন্দন
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, এই সংঘাতের সবচেয়ে আলোচিত মুখ হয়ে ওঠেন উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান। পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের হামলায় তার মিগ-২১ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয় এবং তাকে পাকিস্তান আটক করে। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক সংকট তৈরি হয়।
এনডিটিভির দাবি, ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অভিনন্দনের যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ‘ভূপাতিত’ করেছিলেন। সে সময় উইং কমান্ডার পদমর্যাদায় থাকা অভিনন্দনকে তিন দিন পাকিস্তানে আটক রাখা হয়। পরে ১ মার্চ রাতে তাকে মুক্তি দেয় পাকিস্তান।
ওই বছরের শেষ দিকে মোদি সরকার তাকে বীর চক্র পদকে ভূষিত করে। পুরস্কারের বিবরণে বলা হয়, আকাশযুদ্ধে ‘অসাধারণ দায়িত্ববোধের’ পরিচয় দেয়ার জন্য তাকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ যুদ্ধকালীন বীরত্বের পদকটি দেয়া হয়েছে।

