গাজীপুরের একটি সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া দুটি বিরল প্রজাতির লেমুরের সঙ্গে ভারতের একটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের নাম জড়িয়ে যাওয়ার পর অবশেষে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
ভারতের গুজরাট রাজ্যের জামনগর এলাকায় অবস্থিত সাড়ে তিন হাজার একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি দেশটির এক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর অর্থায়নে পরিচালিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে লেমুর চুরির যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সে বিষয়ে তারা অবগত বলে জানিয়েছে, তবে বাংলাদেশের কোনো তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের কাছে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ বা অনুরোধ পৌঁছায়নি বলেও স্পষ্ট করেছে।
বিবৃতিতে সংরক্ষণ কেন্দ্রটি দাবি করেছে, প্রতিবেদনে উল্লিখিত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের যোগাযোগ বা লেনদেনের সম্পর্ক নেই। তাদের ভাষ্যমতে, কেন্দ্রে থাকা প্রতিটি প্রাণী ভারতীয় আইন অনুযায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানেই রাখা হয়েছে। নিজেদের কাছে থাকা রিং-টেইলড লেমুরগুলোর সম্পূর্ণ নথিপত্র প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের জন্য তারা প্রস্তুত বলেও জানিয়েছে। এমনকি প্রাণীগুলোর পরিচয় বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগকেও তারা স্বাগত জানিয়েছে এবং আইনসম্মত যেকোনো অনুরোধে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুর দুটি ভারতে পাচার করে বিক্রি করা হয়েছিল। তদন্তের এক পর্যায়ে প্রাণী দুটির অবস্থান ওই সংরক্ষণ কেন্দ্রে শনাক্ত হওয়ার পর সেগুলো প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া লেমুর কি না, তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ জন্য ডিএনএ প্রোফাইল যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। কিন্তু সমস্যা হলো, সাফারি পার্কে থাকা অবস্থায় লেমুর দুটির ডিএনএ প্রোফাইল আগে থেকে সংরক্ষণ করা হয়নি, যার ফলে প্রাণী দুটির প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে বন বিভাগের একজন বন সংরক্ষক জানিয়েছেন, তাঁদের নিজস্ব ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তাকে।
এ প্রসঙ্গে একজন প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, সব প্রাণীর ক্ষেত্রে না হলেও অন্তত মূল্যবান ও বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলোর ডিএনএ প্রোফাইল আগে থেকেই সংরক্ষণ করে রাখা উচিত। তাঁর মতে, লেমুর দুটির ডিএনএ তথ্য আগে থেকে সংরক্ষিত থাকলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রমাণ করা অনেক সহজ হতো। তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণী চোরাচালান শনাক্তকরণ ও পাচার হওয়া প্রাণী উদ্ধারের ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রোফাইল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশেষত একই প্রজাতির একাধিক প্রাণীর মধ্যে নির্দিষ্ট একটি প্রাণীর উৎস শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে কার্যকর।
জানা গেছে, আলোচিত লেমুরগুলো প্রায় আট বছর আগে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে জব্দ করা হয়েছিল, এরপর বন বিভাগের নির্দেশে সেগুলোকে সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। পার্কে থাকাকালীন লেমুরদের মধ্যে বাচ্চাও জন্ম নেয়। এর মধ্যে একটি লেমুর কয়েক বছর আগে মারা যায়, আর গত বছরের শেষ দিকে অবশিষ্ট দুটি লেমুর চুরি হয়ে যায়। এই চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ইতিমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলাটি বর্তমানে অপরাধ তদন্ত বিভাগের হাতে রয়েছে।
এই ঘটনা দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার দিক সামনে নিয়ে এসেছে। মূল্যবান বা বিরল প্রজাতির প্রাণীদের জৈবিক তথ্য সংরক্ষণে অবহেলার কারণে চুরি বা পাচারের পর তাদের পরিচয় প্রমাণ এবং ফেরত আনার প্রক্রিয়া কতটা জটিল হয়ে উঠতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্যপ্রাণী পাচার প্রতিরোধে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রমাণনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদার না করা গেলে একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

