ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রিকস জোটের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাষ্ট্রনেতারা। তবে সম্মেলনের আয়োজনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক পুরনো প্রবণতা—রাষ্ট্রীয় অতিথিদের চলাচলের পথের ধারে থাকা দরিদ্র বসতিগুলো বড় পর্দা ও অস্থায়ী বেড়া দিয়ে দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যাওয়া।
দক্ষিণ দিল্লির একটি অভিজাত এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত কয়েকটি বস্তি এভাবে ঢেকে দেওয়ার খবর সামনে আসার পর দেশটির প্রধান বিরোধী দল কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যের অভিযোগ, দারিদ্র্য বিমোচনে বাস্তব উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার বিদেশি অতিথিদের কাছ থেকে দেশের প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র লুকানোর চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ক্ষমতাসীন দল আসলে যে ব্যর্থতা ঢাকতে চায়, তা আড়াল করার এই কৌশলকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।
এমন ঘটনা ভারতে নতুন নয়। এর আগে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরের সময় এবং ২০২৩ সালে জি-টোয়েন্টি সম্মেলন চলাকালেও একই কায়দায় বস্তি আড়াল করার চেষ্টা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জি-টোয়েন্টি সম্মেলনের আগে দিল্লিতে ব্যাপক আকারে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, যাতে দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লিতে পরিচালিত প্রায় ৮০টির মতো উচ্ছেদ কার্যক্রমে সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখের কাছাকাছি মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।
সমালোচকদের মতে, চওড়া রাজপথ আর সাজানো-গোছানো এলাকাই দিল্লির একমাত্র রূপ নয়। রাজধানীর অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ আসলে বস্তিবাসী মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় দেড় দশক আগের জনশুমারির তথ্য বলছে, দিল্লির মোট জনসংখ্যার এক-দশমাংশেরও বেশি মানুষ বস্তি এলাকায় বসবাস করেন। এমনকি কয়েক বছর আগে দেশটির উচ্চকক্ষে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ছয় শতাধিক বস্তিতে প্রায় পনেরো লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, বৈশ্বিক সম্মেলনের চাকচিক্যময় আয়োজনের আড়ালে যে শহুরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য লুকিয়ে আছে, তা সাময়িক পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়া গেলেও বাস্তব সমস্যার কোনো সমাধান হয় না বলে মনে করছেন নগর-বিশ্লেষকরা।
এই সমালোচনার পাশাপাশি বিরোধী দলের আরেকজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ব্রিকসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোটের কূটনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে মতামত দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, ব্রিকস ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট, চতুর্দেশীয় নিরাপত্তা সংলাপ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত সংলাপ বজায় রাখা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো অনেকাংশে কার্যকারিতা হারিয়েছে, অথচ তার বিকল্প হিসেবে নতুন কোনো শক্তিশালী কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। এই শূন্যতার মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জোটের বৈঠকগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, বরং দীর্ঘমেয়াদি এক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মত দেন।
তার মতে, এই ধরনের সম্মেলনের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। দীর্ঘমেয়াদে এই ধারাবাহিক আলোচনার মধ্য দিয়েই একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে আয়োজক শহরের ভেতরকার সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য আড়াল করার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।

