নরেন্দ্র মোদী, শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের হাসিমুখে পরস্পরের হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ছবিটি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
তবে মূল সম্মেলনের ফাঁকে তোলা আরেকটি ছবি এই জোটের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাবের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এবিসি নিউজ লিখেছে, জোটের এই সক্ষমতা বুঝতে ব্রিকসের পটভূমি জানা প্রয়োজন। ২০০৬ সালে জি২০ সম্মেলনের ফাঁকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘ব্রিক’। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা তাতে যোগ দেয়।

ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে বৈঠক হয়। ছবি: রয়টার্স
আর বছর দুয়েক আগে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া যুক্ত হওয়ায় এর সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১১-তে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্ব ব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বাইরে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়াতে কাজ করছে এই জোট।
তবে নেটো বা জি৭ জোটের মত ব্রিকসের সুনির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক ভিত্তি নেই। অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে এ জোট।
বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জোটে ফাটল স্পষ্ট, কারণ ইরান যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে গত সপ্তাহেও সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউজের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিতিগ বাজপেয়ি বলেন, “এই জোটের ভেতরে স্পষ্ট কিছু বিভাজন রয়েছে। ভারত ও ব্রাজিল একে স্রেফ একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে চায়, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন একে ব্যবহার করতে চায় ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে।”

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে জোটের নেতারা। ছবি: ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো/রয়টার্স
মোদী ও শির বড় জয়
এসব অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সত্ত্বেও ১৪০ দফার এক সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণা অনুমোদন করিয়ে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এক বড় কূটনৈতিক বিজয় নিয়ে সম্মেলন শেষ করেছেন। যৌথ ঘোষণায় আফ্রিকার ৫০টিরও বেশি দেশকে চীনের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগে গ্লোবাল সাউথে বাণিজ্যিক নেতৃত্ব দৃঢ় করার এ সুযোগ শির জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুতিন ও পেজেশকিয়ানের পশ্চিমা-বিরোধী সুর
সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ব্রিকস বিজনেস ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিশ্ব অর্থনীতির রূপান্তরের কথা তুলে ধরেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেইন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
মিলনায়তনে উপস্থিতদের করতালির ঝড় ও শিস দিয়ে দেওয়া অভিবাদন প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়াকে একঘরে করার পশ্চিমা চেষ্টা সফল হয়নি।
একই ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত করেন।

ব্রিকস সম্মেলনে গাছের চারা রোপণ করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো/রয়টার্স
সংলাপের সুযোগ কাজে লাগাল ইরান
তবে ব্রিকসের আসল কূটনৈতিক শক্তি উন্মোচিত হয়েছে অন্য এক ছবিতে। সেটি ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদের মুখোমুখি বৈঠকের মুহূর্ত।
ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাত শুরুর পর এটিই ছিল দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে প্রথম আলোচনা।
এবিসি নিউজ লিখেছে, সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সূচিতে না থাকা এই বৈঠকের মেজাজ ছিল কিছুটা শীতল। তবে এই আলোচনার পরই ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ বজায় রাখার সম্মিলিত আহ্বান জানানো হয়।
গবেষক চিতিগ বাজপেয়ি বলেন, “ব্রিকসের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে ভিন্নমুখী মেরুর দেশকে একই টেবিলে এনে বসানোর সামর্থ্যের মধ্যে।”
জোটের বাঁধাধরা নিয়মকানুন না থাকায় এটি জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকা দেশগুলোকেও এক ছাদের নিচে আনার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সাধারণ স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারে।
এবিসি নিউজ লিখেছে, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হুতি বিদ্রোহীরা দখলে নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা যখন নতুন করে চরম রূপ নিচ্ছে, তখন ব্রিকসের মত মঞ্চে সাধারণ স্বার্থে যে কোনো সীমিত ঐকমত্যও সঠিক দিশার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

