অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কড়াকড়ির পথে হাঁটছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটি এখন থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাকপ্যাকার ভিসাধারী এবং যারা নিয়মের ফাঁক গলে একের পর এক ভিসা বদল করে থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে নেন, তাদের ওপরও নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। বৃহস্পতিবার একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বে থাকা একজন শীর্ষ মন্ত্রী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও স্নাতক-উত্তর ভিসার নতুন নিয়মকানুন প্রকাশ করেছেন, যার লক্ষ্য অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা। সরকার সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের নিট অভিবাসনের সংখ্যা কমিয়ে ২ লাখ ২৫ হাজারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা তাদের।
নতুন নিয়মে শিক্ষার্থী ভিসায় পরিবার সঙ্গে আনার সুযোগ বন্ধ হলেও এই বিধিনিষেধ থেকে বাদ রাখা হয়েছে কয়েকটি গোষ্ঠীকে। যারা ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, প্যাসিফিক অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা আবেদনকারী এবং পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকরা এই নতুন কড়াকড়ির আওতার বাইরে থাকবেন।
এ ছাড়া একটি পুরোনো প্রবণতা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার—পড়াশোনা শেষ করার পর কোনো কোনো শিক্ষার্থী তুলনামূলক নিম্নমানের কোর্সে ভর্তি হয়ে দেশে থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে নেন, যা সাধারণত ‘ভিসা হপিং’ নামে পরিচিত। এই প্রবণতা রোধে নতুন নিয়ম আনা হচ্ছে। তবে কোনো শিক্ষার্থী যদি সত্যিকারের উচ্চতর ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চান, সেই সুযোগ বহাল থাকবে।
ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। এখন থেকে এই ভিসার জন্য লটারি পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। এর ফলে দ্বিতীয় বছরের সুযোগ পাওয়া আবেদনকারীর সংখ্যা সীমিত করে ৪৫ হাজারে এবং তৃতীয় বছরের সুযোগ মাত্র ৫ হাজারে নামিয়ে আনা হবে। যদিও দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের এই নতুন সীমার আওতায় ফেলা হচ্ছে না।
দেশটির পরিসংখ্যান সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সাম্প্রতিক ১২ মাসে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ২ কোটি ৭৯ লাখে, যার একটি বড় অংশ এসেছে অভিবাসনের মাধ্যমে—প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার নিট অভিবাসী যুক্ত হয়েছেন এই সময়ে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকট তীব্র হওয়ায় অভিবাসন ইস্যু এখন দেশটিতে একটি বড় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যার প্রেক্ষাপটেই এই কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন নীতির সমালোচনাও হচ্ছে। অভিবাসী পুনর্বাসন খাতে কাজ করা একটি সংস্থার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকে নেওয়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। তার মতে, বিশ্বজুড়ে মেধাবী শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় এই কড়াকড়ি দেশটিকে পিছিয়ে দিতে পারে, কারণ পরিবারসহ থাকার সুযোগ না থাকলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীই বিকল্প দেশ বেছে নিতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত একদিকে অভিবাসনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে অস্ট্রেলিয়ার আকর্ষণ কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। আগামী দিনগুলোতে এই নীতির বাস্তব প্রভাব কেমন হয়, তা নির্ভর করবে অন্য প্রতিযোগী দেশগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র—কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে, তার ওপরও।

