জায়দি পরিচয়ের পুনর্জাগরণ
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল, বিশেষত সৌদি সীমান্তবর্তী সা’দাহ প্রদেশ, শতাব্দীর পর শতাব্দী জায়দি শিয়া মতাদর্শের কেন্দ্র ছিল। ১৯৬২ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে জায়দি ইমামতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলেও, উত্তরের এই পার্বত্য জনপদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সম্পর্ক কখনও সহজ ছিল না। ক্ষমতা, সম্পদ বণ্টন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল এই অঞ্চলে।
১৯৯০-এর দশকে সা’দাহে গড়ে ওঠে ‘বিলিভিং ইয়ুথ’ নামের একটি সংগঠন, যার লক্ষ্য ছিল জায়দি ধর্মীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। সে সময় উত্তর ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সালাফি মতাদর্শের প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি; এই দুই কারণে সংগঠনটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে।
এই আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন সাবেক সংসদ সদস্য হুসেইন বদরুদ্দীন আল-হুথি। তাঁর বক্তৃতায় বারবার উঠে আসত দুর্নীতি, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিরোধিতার প্রসঙ্গ। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও তীব্র করে তোলে।
সশস্ত্র সংঘাতের সূচনা (২০০৪-২০১০)
২০০৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের সঙ্গে হুসেইন আল-হুথির বিরোধ সশস্ত্র রূপ নেয়। কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর সেপ্টেম্বরে হুসেইন নিহত হন, তবে আন্দোলন থেমে যায়নি। নেতৃত্বে আসেন তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি এবং অনুসারীরা পরিচিতি পেতে থাকে ‘হুথি’ নামে যদিও তাদের নিজস্ব নাম আনসারুল্লাহ, অর্থাৎ ‘আল্লাহর সমর্থক’।
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে ছয় দফা সংঘাতে জড়ায় হুথিরা। এই দীর্ঘ লড়াই তাদের কেবল সামরিক অভিজ্ঞতাই দেয়নি, পার্বত্য ভূখণ্ডে গেরিলা যুদ্ধকৌশল, স্থানীয় উপজাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার দক্ষতাও তৈরি করে দেয়। ২০০৯ সালে এই সংঘাত সৌদি সীমান্তে ছড়িয়ে পড়লে রিয়াদ প্রথমবারের মতো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে অর্থাৎ সৌদি-হুথি সংঘাতের সূত্রপাত ২০১৫ সালের অনেক আগেই।
ক্ষমতা দখল ও সৌদি নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ (২০১১-২০১৫)
২০১১ সালের আরব বসন্তে সালেহবিরোধী গণআন্দোলনের সুযোগে হুথিরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। সালেহ পদত্যাগ করলে ক্ষমতায় আসেন আবদুর রব্বু মনসুর হাদি এবং শুরু হয় জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গড়ার প্রচেষ্টা। কিন্তু ফেডারেল কাঠামো, সম্পদ বণ্টন ও উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধ মেটেনি।
২০১৪ সালে জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাসের সিদ্ধান্তে জনজীবনে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে হুথিরা ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত করে এবং সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই অভিযানে তাদের পাশে ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর অনুগত সামরিক-রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক — যে সালেহর বিরুদ্ধে এক দশক আগেই তারা যুদ্ধ করেছিল। এই কৌশলগত জোট ইয়েমেনি রাজনীতিতে মতাদর্শের চেয়ে ক্ষমতার সমীকরণ কতটা প্রাধান্য পায়, তা স্পষ্ট করে দেয়।
২০১৫ সালের মার্চে হুথিরা সানা থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হতে থাকলে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবের সহায়তা চান। এরপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে যার আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য ছিল স্বীকৃত সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, তবে রিয়াদের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি ছিল আরও গভীর: নিজেদের সীমান্তের ওপারে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং তার সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক রিয়াদের জন্য বড় কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।
ইরান সংযোগ: বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা
হুথি আন্দোলন মূলত ইরানের তৈরি কোনো প্রক্সি বাহিনী নয় বরঞ্চ এর শিকড় উত্তর ইয়েমেনের নিজস্ব জায়দি সমাজ ও রাজনীতিতে প্রোথিত। তবে সময়ের সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হয়েছে। অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে প্রমাণ ও অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে। গবেষকরা অবশ্য সতর্ক করেন হুথিদের পুরোপুরি ‘ইরানের পুতুল’ হিসেবে দেখলে তাদের স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক ভিত্তি আড়ালে পড়ে যায়।
সালেহর পতন ও যুদ্ধের দীর্ঘায়ন (২০১৭-২০২২)
২০১৭ সালে সালেহ হুথিদের সঙ্গে জোট ভেঙে সৌদি-সমর্থিত পক্ষে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে এবং ডিসেম্বরে তিনি নিহত হন। এরপর উত্তর ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও সংহত হয়। ২০১৫ থেকে পরবর্তী বছরগুলোয় সৌদি জোটের বিমান হামলা, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা, স্থলযুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষের কারণে ইয়েমেন পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রে। ২০২২ সালে জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি বড় আকারের সংঘর্ষ কমিয়ে আনলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।
লোহিত সাগরে রূপান্তর (২০২৩)
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে, দাবি করে এটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে একটি স্থানীয় ইয়েমেনি আন্দোলন বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথের নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি: সেপ্টেম্বর ২০২৬
চলতি মাসে হুথিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত সামরিক অগ্রগতি ঘটিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা কৌশলগত বন্দর শহর মোখা দখল করে নেয়, এরপর দুবাব শহর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থিত মাইয়ুন (পেরিম) দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনের সমগ্র লোহিত সাগর উপকূলরেখা কার্যত হুথি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় কৌশলগত ধাক্কা, কারণ এতে বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর হুথিদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে — যে প্রণালী দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হয়। একইসঙ্গে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেন সরকার এই পরিস্থিতিকে নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছে।
হুথিদের কেবল ‘ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া’ বা কেবল ‘জায়দি ধর্মীয় আন্দোলন’ বললে তাদের বর্তমান বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। তিন দশকের বিবর্তনে তারা একইসঙ্গে ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন, শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী এবং উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনের বিস্তৃত অংশে কার্যকর শাসন প্রতিষ্ঠাকারী একটি ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ধর্ম, উপজাতীয় রাজনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতার সংকট, সৌদি নিরাপত্তা উদ্বেগ, ইরানের আঞ্চলিক কৌশল এবং লোহিত সাগরের ভূরাজনীতি এই সবকিছু মিলেই আজকের হুথি শক্তির চেহারা তৈরি হয়েছে। ফলে হুথিদের দিকে তাকানো মানে কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং আরব উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তার দিকেও দৃষ্টি দেওয়া।

