ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ এবং সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগসংবলিত একটি সরকারি চিঠির প্রতিবাদ জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের কয়েকটি দাতব্য সংস্থা, ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত প্যালেস্টাইন অ্যাকশন। সূত্র: আল-জাজিরা
সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ইসরায়েলের একটি সরকারি নথিতে তাদের প্রতিনিধি ও কর্মীদের মানহানি করা হয়েছে এবং দেশটিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আল জাজিরার দেখা ওই নথিটি ইসরায়েলের প্রবাসী বিষয়ক ও ইহুদি-বিদ্বেষ দমন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। এতে সীমান্ত কর্তৃপক্ষকে অক্সফাম, ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড, সেভ দ্য চিলড্রেন, মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ানস (এমএপি) এবং যুক্তরাজ্যের অর্থায়নপ্রাপ্ত নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মতো মানবিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন এবং ফ্রেন্ডস অব আল-আকসার মতো প্রচারণামূলক সংগঠনের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিডিএস সমর্থনের অভিযোগ
৮ সেপ্টেম্বরের ওই চিঠিটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে আসে, যখন যুক্তরাজ্য অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল।
চিঠিতে ফ্রেন্ডস অব আল-আকসার প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইল প্যাটেলের বিরুদ্ধে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্যাটেল আল জাজিরাকে বলেন, তার সংগঠন বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলনের সমর্থক হওয়ায় ইসরায়েল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, “ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা আমাদের ভয় দেখাতে পারবে না।”
ইসরায়েলের প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আল জাজিরার অনুরোধে কোনো মন্তব্য করেনি।
বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার পর পাল্টা পদক্ষেপ
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের আগে ইসরায়েল সতর্ক করেছিল যে এর ‘পরিণতি’ হতে পারে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই পদক্ষেপকে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
এরপর ইসরায়েল ১১ জন ব্রিটিশ এমপি ও একজন আইনজীবীর প্রবেশে বাধা দেয় বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ এবং দক্ষিণ ইসরায়েলের কিরিয়াত গাতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক গাজা সহায়তা কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
এ ছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাহিনীকে দেওয়া ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
ফাঁস হওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বয়কট, নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ উৎসাহিত করা ব্রিটিশ সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
![উপরের সারিতে বাম থেকে: ইসরায়েল কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত যুক্তরাজ্যের সাংসদদের মধ্যে রয়েছেন জেরেমি করবিন, অ্যাড্রিয়ান রামসে, ডায়ান অ্যাবট, সিয়ান বেরি, এলি চাউন্স এবং নাজ শাহ। নিচের সারিতে বাম থেকে: এছাড়াও রয়েছেন সাংসদ কার্লা ডেনিয়ার, জারা সুলতানা, হান্না স্পেন্সার, রিচার্ড বার্গন, জন ম্যাকডোনেল। নিচের ডানদিকে থাকা ফাহাদ আনসারি, যিনি আদালতে হামাসের প্রতিনিধিত্বকারী একজন আইনজীবী, তাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে [গেটি ইমেজ]।](https://www.aljazeera.com/wp-content/uploads/2026/09/Untitled-1-copy-1789577098.jpg?w=770&resize=770%2C513&quality=80)
মানবিক সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ
চিঠিতে মোট ১১টি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি, হামাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পক্ষে অবস্থান নেওয়া, মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা কিংবা সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগ।
সেভ দ্য চিলড্রেনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘ইচ্ছাকৃত অনাহার’ এবং ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেন, অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার মতো তারাও বর্তমানে ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত দিয়ে গাজা ও পশ্চিম তীরে কর্মী প্রবেশের অনুমতি পেতে সমস্যায় পড়ছে, এমন এক সময়ে যখন মানবিক সহায়তার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন ও এমএসএফ নিয়েও বিতর্ক
চিঠিতে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপে জড়িত একটি উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি বলেন, এই চিঠি প্রমাণ করে যে তাদের নিষিদ্ধ করার ভিত্তি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্ক নয়; বরং তাদের কার্যক্রম ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের বিরুদ্ধে ছিল।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ‘লইয়ার্স ফর ইসরায়েল’ নামের একটি সংগঠন সরকারকে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)-কে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, এমএসএফ ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে।
তবে এমএসএফ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা কয়েক মাস ধরে একটি ‘বিভ্রান্তিকর প্রচারণার’ লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ইসরায়েলের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মীদের সামরিক সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তাদের মৃত্যুর আগে দেওয়া হয়নি।
ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠনগুলোর মধ্যে চলমান এই বিরোধ গাজা যুদ্ধের পর আরও তীব্র হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে মানবিক সহায়তা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান।

