কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ভবিষ্যতের যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে বিশ্বের বড় সামরিক শক্তিগুলো। দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দেখিয়েছে, সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এআইয়ের সহায়তায় তৈরি একটি ভুল গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রায় দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করতে পারত। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলাকালীন সময়ে একটি প্রতিবেদন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত একটি চীনা জাহাজ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহন করছে।
এই তথ্য পাওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে। চারটি সূত্র জানিয়েছে, জাহাজটি আটকানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এমনকি দুইটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সশস্ত্র সামরিক সদস্যরা জাহাজে ওঠার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। একই সময়ে সামরিক বিমানও আকাশে অবস্থান নিয়েছিল বলে জানা গেছে।
তবে অভিযান শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে কর্মকর্তারা প্রতিবেদনের উৎস ও তথ্য যাচাই করতে গিয়ে বড় একটি সমস্যা খুঁজে পান। তারা জানতে পারেন, প্রতিবেদনটি তৈরি করার সময় একজন বিশেষ অভিযান কমান্ডের বিশ্লেষক এআই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছিলেন। ব্যবহৃত এআই চ্যাটবট জাহাজের বহন করা পণ্যের বিষয়ে ভুল তথ্য বিশ্লেষণ করেছিল।
সূত্রগুলোর একজন জানিয়েছেন, ওই প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভুল ছিল। আরেকজন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ভুল তথ্য এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা প্রায় বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারত। কারণ চীনের একটি জাহাজের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক অভিযান দুই দেশের সম্পর্ককে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে যেতে পারত।
ঘটনাটি শুধু একটি ভুল প্রতিবেদনের বিষয় নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণের জন্য এআই ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। লক্ষ্য নির্বাচন, সামরিক সরঞ্জামের অবস্থান নির্ধারণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাজেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষ দেশগুলোও যদি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাহলে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এআই ব্যবহারের পরিধি দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের গতি বাড়ানোর জন্য একটি কৌশল ঘোষণা করেন। ওই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ করা এবং নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বাড়ানো।
তবে সমস্যা হলো, সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশে এআই ব্যবহারের নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক রকম নয়। একাধিক কর্মকর্তার মতে, বিভিন্ন বিভাগ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ফলে তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি, নিরাপত্তা মান এবং নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো এআইয়ের ভুল তথ্য তৈরি করার ক্ষমতা, যাকে প্রযুক্তিগতভাবে অনেক সময় “ভুল কল্পনা” বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি বলা হয়। সাধারণ ক্ষেত্রে এমন ভুল হয়তো বড় সমস্যা তৈরি করে না, কিন্তু সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
যদি কোনো সামরিক বাহিনী ভুল তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তাহলে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি কিংবা দুই দেশের মধ্যে অপ্রত্যাশিত সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পারমাণবিক সক্ষমতা থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভুল হিসাব আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এআই ব্যবহারের কারণে অনেক বিশ্লেষকের ওপর দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি ও সরবরাহ করার চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ বিশ্লেষকদের মধ্যে এআইয়ের তৈরি তথ্যকে যাচাই না করে গ্রহণ করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
একজন সূত্রের ভাষায়, এআই মানুষকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে, কিন্তু একই সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্তেও দ্রুত পৌঁছে দিতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তির গতি যদি মানুষের যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা নয়, বরং মানুষের সঠিক তদারকি ও যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। উন্নত প্রযুক্তি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করলেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্তে মানুষের বিচার-বিবেচনা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাইয়ের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
ভবিষ্যতে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এআইয়ের ভূমিকা আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের নীতি তৈরি না হলে এআইয়ের একটি ছোট ভুলও বড় আন্তর্জাতিক সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

