আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এমন পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আদালতটির সঙ্গে বেশির ভাগ আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলার সময় এই সপ্তাহেই সংশ্লিষ্ট নির্বাহী পদক্ষেপ চূড়ান্ত হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা একাধিক সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, চলতি সপ্তাহে অথবা তার ঠিক পরেই ওয়াশিংটন এসব নির্বাহী পদক্ষেপ চূড়ান্ত করতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা জারির পর ছয় থেকে সাত মাসের একটি সময়সীমা থাকবে। ওই সময় পার হলে আদালতের সঙ্গে বেশির ভাগ আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংকিং, চুক্তি ও বাণিজ্যিক যোগাযোগে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এবার যা ভাবা হচ্ছে, তা এতদিনের নীতির চেয়ে বড় পরিবর্তন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র শুধু আদালতের নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মীদের লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় নিশানা করা হচ্ছে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে।
ইতিমধ্যে আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা একটি নির্বাহী আদেশের আওতায় এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই আদেশে আদালতের বিচারিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল।
সংকটের শুরু ২০২৪ সালে। ওই বছর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই পরোয়ানা দেওয়া হয়। গাজায় সংঘটিত কথিত অপরাধের তদন্তের পর আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকেই আদালতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে আসছে।
সম্ভাব্য নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র। এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
প্রথমত, ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞার এই সরে আসা ওয়াশিংটনের কৌশলে বড় বদল। কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা মূলত প্রতীকী চাপ তৈরি করে। কিন্তু পুরো আদালতকে লক্ষ্য করলে তার দৈনন্দিন কাজ, অর্থ লেনদেন ও সেবা গ্রহণে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ছড়ায়। বিশ্বের অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মার্কিন ডলার ও মার্কিন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই আদালতের সঙ্গে লেনদেনে বিদেশি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁকি এড়াতে দূরত্ব বজায় রাখতে পারে। তবে বাস্তবে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত পরিধির ওপর।
তৃতীয়ত, ছয় থেকে সাত মাসের সময়সীমা একটি প্রস্তুতির সুযোগ দিতে পারে। এই সময়ে আদালত ও তার সদস্য দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক দরকষাকষির পথও খোলা থাকবে।
চতুর্থত, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় এই পদক্ষেপ চূড়ান্ত হলে তা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনা তৈরি করতে পারে। আইসিসির স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সবশেষে, এটি এখনো প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য। নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট শর্ত, কার্যকরের সময় ও পরিধি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে নিশ্চিত নয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

