ইতালির শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন নীতিগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা সামনে এনেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। স্কুলে বোরখা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি একটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অভিবাসন ও সামাজিক একীভূতকরণ বর্তমানে ইতালির রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটিতে বিদেশি নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তার রাজনৈতিক দল ব্রাদার্স অব ইতালির যুব শাখার একটি অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রিসভায় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
মেলোনির বক্তব্য অনুযায়ী, ইতালির শিক্ষা ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে যেসব বিদেশি শিক্ষার্থীর বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে, তাদের অভিভাবকদের জন্য ইতালীয় ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা চালুর বিষয়েও চিন্তা করা হচ্ছে। তার মতে, ভাষাগত দক্ষতা শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও শিক্ষাগত অন্তর্ভুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইতালির স্কুলে বোরখা ও নিকাব পরার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা আনা হবে।
তবে বর্তমানে ইতালিতে স্কুল বা জনসমক্ষে বোরখা নিষিদ্ধ করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট আইন কার্যকর নেই। দেশটির প্রচলিত আইনে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয় এমন পোশাক ব্যবহারের বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে।
১৯৭৫ সালের একটি আইনে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া এমন পোশাক বা হেলমেট ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার কারণে কোনো ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ২০০৮ সালে ইতালির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত জানিয়েছিল, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণে পুরো মুখ ঢেকে রাখা পোশাক পরা যেতে পারে। তবে প্রয়োজন হলে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য মুখ দেখাতে হবে।
এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশটির ন্যাশনাল ফিউচার পার্টি স্কুলে বোরখা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছিল। দলটি মেলোনির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ নয় এবং অভিবাসন বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
এ ছাড়া মেলোনির জোটের শরিক লিগ পার্টিও চলতি বছরের শুরুতে ইতালির সিনেটে একটি প্রস্তাব জমা দেয়। ওই প্রস্তাবে খেলাধুলার অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় স্থানের মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া মুখ ঢেকে রাখা পোশাক ও হেলমেট নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছিল।
বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। মেলোনি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সীমিত করার কথা বললেও নতুন নিয়মের বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট করেননি।
বর্তমানে ইতালির শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যার জন্য একটি সীমা রয়েছে। ২০১০ সাল থেকে কার্যকর থাকা নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণভাবে একটি স্কুল বা শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা যায়।
তবে এই নিয়মে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। ইতালিতে জন্ম নেওয়া এবং ইতালীয় ভাষায় ভালো দক্ষতা থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সীমা বাড়ানো যেতে পারে। আবার যেসব শিক্ষার্থীর ভাষাগত দক্ষতা কম, তাদের ক্ষেত্রে সীমা কমানোর সুযোগও রয়েছে।
ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা আইএসটিএটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির স্কুলে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১২ শতাংশ বিদেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভিবাসন ও শিক্ষা নীতি এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকার ভাষা শিক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে পোশাক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়গুলো নিয়ে নতুন নীতিগত বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
মেলোনি সরকারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে ইতালির স্কুল ব্যবস্থায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একীভূতকরণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের ওপর।

