ইউরোপের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলমান থাকলেও ইউরোপের অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, এই সংঘাত ভবিষ্যতে ইউক্রেনের সীমান্ত ছাড়িয়ে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ সম্প্রতি সুয়ালকি করিডরের কাছে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোকে ন্যাটোর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটি গোপনীয় নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন। এরপর তিনি রাশিয়ার কথিত বাড়তে থাকা বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার জন্য নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক আরও সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে এবং সেগুলোকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাজ্য সাধারণ নাগরিকদের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা প্রধান জানিয়েছেন, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ব্রিটেন।
জার্মানিও সম্ভাব্য রুশ হামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতাল ও জরুরি ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত করার কাজ করছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস ইউরোপের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
এমনকি ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা সুইজারল্যান্ডও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে সামরিক হামলা মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার কৌশল বদলাচ্ছে কি?
ইউরোপের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে যে দেশটি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটররা সম্প্রতি রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, এই নেটওয়ার্ক বিভিন্ন দেশে হামলা ও হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইউরোপের কয়েকটি দেশের বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো গত কয়েক বছর ধরে সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের মতো ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এগুলো অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে না। ফলে কোনো দেশকে সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ধরনের সীমিত ও অস্বীকারযোগ্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া যাচাই করার চেষ্টা করা হতে পারে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

সুয়ালকি করিডর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইউরোপের নিরাপত্তা আলোচনায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এলাকাগুলোর একটি হলো সুয়ালকি করিডর।
পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী এই প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত অঞ্চলটি ন্যাটোর জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বাল্টিক অঞ্চলের দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে ন্যাটোর বাকি অংশের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত করেছে।
যদি কোনো সংকট তৈরি হয় এবং রাশিয়া বা বেলারুশ এই অঞ্চলে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠবে, ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশ একটি ছোট সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্য কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
এই অনিশ্চয়তাই রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে অনেক ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক মনে করছেন।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জানিয়েছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জোট নিয়মিত সামরিক মহড়া পরিচালনা করে এবং কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলার ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
তবে বাস্তবে রাজনৈতিক ঐক্য কতটা থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ইউরোপের শিক্ষা
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন শিক্ষা দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে শুধু অস্ত্র ও সেনাবাহিনী থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন এমন অবকাঠামো, যা হামলার মধ্যেও কার্যকর থাকতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, হাসপাতাল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ এবং সরকারি কার্যক্রম সচল রাখার সক্ষমতা এখন প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ন্যাটো সম্প্রতি সংকট ও সংঘাতের সময় জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন কিছু নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকার পরিচালনার ধারাবাহিকতা, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়।
ইউক্রেন দীর্ঘ সময় ধরে রুশ হামলার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোপ এখন সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা শুধু সামরিক জবাব দেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। একটি দেশ বা জোট কতটা দীর্ঘ সময় চাপ মোকাবিলা করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ
ইউরোপের বর্তমান প্রস্তুতির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানসংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
ফলে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে একাধিক অঞ্চলে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে শক্তিশালী করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসবে, তা নিয়ে ইউরোপে আলোচনা রয়েছে।
রাশিয়া এই অনিশ্চয়তাকে বিবেচনায় নিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
তাদের মতে, রাশিয়া ইউক্রেনের মতো বড় আকারের অভিযান না চালিয়েও ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন হামলা, গোপন অভিযান বা সীমিত সামরিক পদক্ষেপ।
ইউরোপের পুরোনো ধারণার পরিবর্তন
শীতল যুদ্ধের পর প্রায় তিন দশক ধরে ইউরোপের অনেক দেশ মনে করেছিল বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি অনেক দূরের বিষয়। ফলে সামরিক প্রস্তুতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় অনেক দেশ আগের তুলনায় কম গুরুত্ব দিয়েছে।
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
বর্তমানে ইউরোপীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে, প্রতিরোধ ক্ষমতা শুধু অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে বোঝাতে হয় যে কোনো আগ্রাসনের ফলাফল সফল হবে না।
এই কারণেই ইউরোপজুড়ে সামরিক প্রস্তুতি, অবকাঠামো সুরক্ষা এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাশিয়া কি ইউক্রেনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি নেবে, নাকি ইউরোপের এই প্রস্তুতি শুধুই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে থাকবে।
ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, যুদ্ধ এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমন প্রস্তুতি তৈরি করা, যাতে কোনো আগ্রাসন শুরু করার আগেই প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে এর মূল্য অনেক বেশি হবে।
তবে ইউরোপের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো দেখাচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর নিরাপত্তা ভাবনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন ইউরোপ শুধু চলমান সংঘাতের দিকে তাকিয়ে নেই, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার জন্য নিজেদের নতুনভাবে প্রস্তুত করছে।

