রাশিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ইউরোপে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপের গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের আশঙ্কা, রাশিয়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া ও ঐক্য যাচাই করার জন্য কোনো ধরনের সীমিত পদক্ষেপ নিতে পারে।
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়া শিগগিরই ন্যাটোর কোনো দেশে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বরং তাদের আশঙ্কা, মস্কো সীমিত আকারের উসকানি, চাপ সৃষ্টি বা পরীক্ষামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ন্যাটোর অবস্থান যাচাই করতে পারে।
চেক প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা তথ্য সংস্থার পরিচালক মিখাল কৌদেলকা জানিয়েছেন, রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় সীমিত অনুপ্রবেশ, সাজানো ঘটনা তৈরি, ড্রোন কার্যক্রম বাড়ানো এবং ব্যাপক তথ্য প্রচারণার মতো বিষয় থাকতে পারে।
তার মতে, রাশিয়ার লক্ষ্য হতে পারে পশ্চিমা দেশগুলোর দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা কমানোর জন্য চাপ তৈরি করা।
কৌদেলকা বলেন, মস্কোর কৌশলের একটি অংশ হলো এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে প্রতিপক্ষ সরাসরি বড় সংঘাতে না গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
লাটভিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার মহাপরিচালক নরমুন্ডস মেজভিয়েটস জানিয়েছেন, রাশিয়া ইউরোপে বড় কোনো পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন কিছু লক্ষণ থাকলেও বর্তমানে সরাসরি হামলার কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
তিনি বলেন, রাশিয়ার কার্যক্রমের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এটি কি সত্যিই কোনো সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি, নাকি পশ্চিমা সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করার একটি কৌশল, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
ইউরোপের বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে সতর্ক করে আসছে। তবে তারা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাসচিব জোনাতান ভেসিওভ বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং বাস্তব তথ্যের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন।তার মতে, ভয় ছড়িয়ে পড়লে সেটি প্রতিপক্ষের কৌশলের অংশ হয়ে যেতে পারে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করেছেন, রাশিয়া ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো সীমিত পদক্ষেপ নিয়ে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করতে পারে।
তিনি বলেন, মস্কো হয়তো দেখতে চাইবে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শুধু কাগজে রয়েছে, নাকি বাস্তবেও কার্যকর।
ন্যাটোর মূল নীতিতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে বাস্তবে এমন পরিস্থিতিতে ৩২টি সদস্য দেশ কতটা দ্রুত ও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ টাস্কের সতর্কতাকে যুক্তিসংগত ও তথ্যভিত্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্যারিসে একটি জরুরি বৈঠক করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন।
বর্তমান উত্তেজনা শুধু সামরিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, নাশকতা, তথ্য প্রচারণা এবং বিভিন্ন ধরনের গোপন কার্যক্রমের অভিযোগ করেছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেগুলো সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয় না, কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ন্যাটোর ওপর হামলার পরিকল্পনার খবরকে বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে মন্তব্য করেছেন।
ইউরোপের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা।গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করেন এবং রিগাতেও যান। তবে এই সফরের উদ্দেশ্য রাশিয়াকে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ মস্কো এবং কিয়েভ সফর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের অনেকে রাশিয়ার আলোচনার আগ্রহ নিয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, মস্কো আলোচনার পাশাপাশি নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলমান। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার রাজধানী মস্কো লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ব্যবহার করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে বলে খবর এসেছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে নাশকতা চালানো এবং বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা পরীক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে।তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যা সরাসরি ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলো একদিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া যদি ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া যাচাই করার জন্য সীমিত কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে জোটের ঐক্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাত শুধু সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও এখন নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে বর্তমান উত্তেজনা তাই শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

