যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুন একটি ২৪ ঘণ্টার সম্প্রচারমাধ্যম চালু করেছে। ‘ট্রাম্প টিভি’ নামে চালু হওয়া এই নতুন মাধ্যমের মাধ্যমে হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, বিভিন্ন কার্যক্রম এবং নিজেদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সরাসরি প্রচার করা হবে।
মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। মূলধারার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান বিরোধের মধ্যেই নতুন এই সম্প্রচারব্যবস্থা চালুর ঘটনা সামনে এলো। বিশেষ করে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্ক যখন তীব্র হয়ে উঠেছে, তখন নিজেদের বক্তব্য সরাসরি দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আলাদা একটি মাধ্যম তৈরি করাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের সরকারি ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ‘ট্রাম্প টিভি’ সম্প্রচার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো এক জায়গায় তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদও সার্বক্ষণিকভাবে সরাসরি প্রচারের কথা জানানো হয়েছে।
নতুন এই উদ্যোগের ফলে হোয়াইট হাউসের হাতে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশের জন্য আরও একটি সরাসরি মাধ্যম তৈরি হলো। সাধারণত কোনো প্রেসিডেন্ট বা সরকারকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিতে সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে সরাসরি সম্প্রচারের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকলে প্রশাসন কোনো ঘটনা কীভাবে উপস্থাপন করবে, সে বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।
তবে ‘ট্রাম্প টিভি’ চালুর সময়টিই বিষয়টিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কারণ এর কয়েক দিন আগে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এর প্রতিবাদে ওই সংবাদমাধ্যমগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের পছন্দের সঙ্গে তাদের সংবাদ পরিবেশন না মেলায় এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম ও পঞ্চম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভুয়া খবরের অভিযোগ এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ব্যবহৃত সূত্রের প্রশ্ন।
ট্রাম্প বিশেষ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের সমালোচনা করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, এ ধরনের সূত্র ব্যবহার করে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। হোয়াইট হাউসে এমন সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার থাকা উচিত কি না, সেটিও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
এই অবস্থানকে ঘিরেই প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে মতবিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমগুলোর বক্তব্য হলো, কোনো সরকারের সঙ্গে তাদের প্রতিবেদনের মতপার্থক্য থাকলেই সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়।
সিএনএনের পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি বড় সংবাদমাধ্যম। এবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স নিউজ ও এনবিসি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকারের পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে কোনো সংবাদ সংস্থাকে বিধিনিষেধের আওতায় আনা উচিত নয়। এমনকি বিকল্প কোনো প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়েও তারা সম্মতি দেয়নি।
ঘটনাটি শুধু একটি সংবাদমাধ্যম ও হোয়াইট হাউসের বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রভাব পড়েছে প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও।
সোমবার হোয়াইট হাউসের নতুন হেলিপ্যাড প্রদর্শনের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করেনি সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বড় সংবাদ নেটওয়ার্ক। ওই অনুষ্ঠানে হেলিকপ্টারের তীব্র শব্দের কারণে ট্রাম্পের বক্তব্য স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরে নিউইয়র্কের উদ্দেশে মেরিন ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও উত্তর দেননি তিনি।
এই পরিস্থিতিতে ‘ট্রাম্প টিভি’ চালুর বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একদিকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে, অন্যদিকে হোয়াইট হাউস নিজেই দর্শকদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর জন্য একটি পৃথক সম্প্রচারব্যবস্থা তৈরি করছে।
এখানে যোগাযোগের ধরনেও একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রচলিত সংবাদমাধ্যম সাধারণত কোনো বক্তব্য বা সরকারি ঘোষণাকে যাচাই, বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে দর্শকের সামনে তুলে ধরে। কিন্তু সরকারের নিজস্ব সম্প্রচারমাধ্যমে মূলত সরকারের বক্তব্য ও কার্যক্রম সরাসরি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একই ঘটনার সরকারি ব্যাখ্যা ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
‘ট্রাম্প টিভি’ সেই কারণে শুধু নতুন কোনো সম্প্রচার সেবা নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জনসংযোগ ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরনেও একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, প্রশাসনের কর্মকাণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের ভাষ্য তুলে ধরার সুযোগ এখন তাদের হাতে থাকছে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে দর্শকরা এটিকে কীভাবে গ্রহণ করেন এবং সংবাদ ও সরকারি প্রচারের মধ্যে পার্থক্য কীভাবে নির্ধারণ করেন তার ওপর। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি তথ্যের প্রবাহ এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিতর্ক চলছে, ‘ট্রাম্প টিভি’ সেটিকে আরও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
এদিকে আদালতে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর করা মামলার পরবর্তী কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত কতটা বৈধ এবং সংবাদ সংগ্রহের অধিকার নিয়ে কী ধরনের ব্যাখ্যা আসে, তার ওপর ভবিষ্যতের পরিস্থিতির একটি অংশ নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, ‘ট্রাম্প টিভি’ চালুর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছানোর একটি নতুন পথ তৈরি করেছে। একই সময়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সরকার ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক, সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা এবং সরকারি তথ্য প্রচারের ধরন—এই তিনটি বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

