ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সীমিত সময়ের জন্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিমান বাহিনীকে আকাশপথে প্রতিরক্ষামূলক জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করবে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সহায়তা মূলত প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া হবে এবং এটি কয়েক সপ্তাহের জন্য কার্যকর থাকতে পারে। সাইপ্রাসে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের আক্রোতিরি সামরিক ঘাঁটিতে থাকা একটি ভয়েজার বিমান এ কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম বলেন, যুক্তরাজ্যের স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগ বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সৌদি আরব ধারাবাহিক হামলার শিকার হচ্ছে এবং পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলেই যুক্তরাজ্য সৌদির অনুরোধে সাড়া দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সহায়তা সৌদি বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলোর আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি সীমিত সহায়তা।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলে আসছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে সৌদি আরব, অন্যদিকে হুথিরা ইয়েমেনের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুথিরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির লোহিত সাগর উপকূলীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোও এসব হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিহত করতে সৌদি বিমান বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সাইপ্রাসে থাকা ভয়েজার বিমানটি রয়্যাল এয়ার ফোর্সের নয়টি বিমানের একটি। এর মধ্যে আটটি বিমান সামরিক কাজে নিবন্ধিত এবং একটি বেসামরিক নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে। এছাড়া সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য আরও পাঁচটি একই ধরনের বিমান রয়েছে ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হুথিরা ইরানের সমর্থনপুষ্ট একটি গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবও হুথিদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। হুথিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং প্রবেশপথের কাছে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য লোহিত সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশেষ করে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের এই সহায়তা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে সীমিত। তাদের মতে, এটি সরাসরি বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে একটি কৌশলগত সহযোগিতা।
অন্যদিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই সহায়তা সৌদি আরবকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনায় সাহায্য করবে।
যুক্তরাজ্য এর আগেও ইয়েমেন পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হুথিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ বিমান হামলায় অংশ নিয়েছিল ব্রিটেন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার ওপর হুথিদের হামলার জবাবে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ওই অভিযান চালানো হয়েছিল।
এদিকে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সৌদি আরবের প্রতি সহযোগিতার বিষয়টি ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে আলোচনায় আসতে পারে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় মিত্ররা পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং ন্যাটোর সহায়তার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা হবে।
তবে যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরেও আলোচনা চলছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও ব্রিটিশ সরকার বলছে, বর্তমান সহায়তা সীমিত এবং এর ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রিত।
সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবকে যুক্তরাজ্যের এই সামরিক সহায়তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইয়েমেন সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করতে পারে।

