বিশ্ব কূটনীতির সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর একটি জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক শুরু হচ্ছে ২২ সেপ্টেম্বর। এই অধিবেশনে বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ, শান্তি, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবেন।
নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন বিশ্বনেতাদের এক জায়গায় নিয়ে আসে। প্রতিবছর এই অধিবেশন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক বৈঠক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকনির্দেশনার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২০২৬ সালের সাধারণ অধিবেশনের বার্ষিক অধিবেশন শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর। এ বছরের অধিবেশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান, যিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
অধিবেশন কবে এবং কতদিন চলবে?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর।
এই বিতর্ক চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার কোনো অধিবেশন থাকবে না এবং ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার আবার কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রতিদিন দুটি সেশনে বক্তব্য অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত প্রথম অধিবেশন এবং বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দ্বিতীয় অধিবেশন চলবে।
প্রতিটি দেশের বক্তব্যের জন্য সাধারণত ১৫ মিনিট সময় নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে অনেক নেতা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় বক্তব্য দেন।
কারা প্রথম বক্তব্য দেবেন?
প্রথা অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিতর্কে প্রথম বক্তব্য দেয় ব্রাজিল। এই নিয়মের শুরু ১৯৫৫ সালে, যখন কোনো দেশ প্রথমে বক্তব্য দিতে আগ্রহী না হওয়ায় ব্রাজিল স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব নেয়।
এরপর সাধারণত আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বক্তা হয়।
এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রাজিলের পর বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় সময় প্রায় ৯টা ৪৫ মিনিটে তার বক্তব্য দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্য দেশগুলোর বক্তব্যের ক্রম নির্ধারণ করা হয় রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব, সংশ্লিষ্ট দেশের পছন্দ এবং ভৌগোলিক ভারসাম্যের ভিত্তিতে।
ভ্যাটিকান সিটি, ফিলিস্তিন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ অধিবেশনের মূল আলোচনার বিষয় কী?
২০২৬ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল প্রতিপাদ্য হলো, “আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ”।
এই বছরের আলোচনায় কয়েকটি বড় বৈশ্বিক বিষয় গুরুত্ব পাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন পরিস্থিতি, আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উন্নয়ন, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও আলোচনা হবে।
জাতিসংঘ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রস্তুতি, বর্ণবাদবিরোধী উদ্যোগ এবং পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূলের মতো বিষয়েও বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব কে হবেন?
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। তাই নতুন মহাসচিব নির্বাচন এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিয়োগ করে। তবে এর আগে নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত নয়জন মহাসচিব দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সবাই পুরুষ ছিলেন। এবার কয়েকটি দেশ প্রথমবারের মতো একজন নারী মহাসচিব নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছে।
বর্তমানে সাতজন প্রার্থী আলোচনায় রয়েছেন।
কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, যিনি জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধান এবং দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট।
গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট, যিনি জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইকুয়েডরের ইভন বাকী, যিনি কূটনীতিক ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী।
ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, যিনি সাবেক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি, যিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক।
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাকি সাল।
উগান্ডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা ওলারা ওতুন্নু।
সাবেক চিলির প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট সম্প্রতি প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সমর্থন ছাড়া কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত হতে পারবেন না।
জাতিসংঘ সদর দপ্তর কোথায়?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে।
ইস্ট রিভারের পাশে অবস্থিত এই ভবনটি ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। এটি জাতিসংঘের নিজস্ব সম্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
তবে জাতিসংঘের প্রথম ছয়টি সাধারণ অধিবেশন নিউইয়র্কে হয়নি। প্রথম অধিবেশন হয়েছিল লন্ডনে এবং পরবর্তী কয়েকটি অধিবেশন প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৫২ সালের পর থেকে প্রায় সব অধিবেশন নিউইয়র্কেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ করা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, মানবাধিকার রক্ষা এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩টি। এর পাশাপাশি ফিলিস্তিন ও ভ্যাটিকান সিটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত রয়েছে।
প্রতিটি সদস্য দেশের সাধারণ পরিষদে একটি করে ভোট রয়েছে। তবে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত সাধারণত বাধ্যতামূলক নয়, বরং সুপারিশমূলক।
অন্যদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৫টি সদস্য দেশ রয়েছে, যেখানে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ অনেক সময় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে সমর্থকদের মতে, বিশ্বের প্রায় সব দেশকে একই জায়গায় আলোচনায় আনার মতো আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।
২০২৬ সালের অধিবেশনের গুরুত্ব
এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব একাধিক সংকটের মুখোমুখি।
যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার সংকট—সব মিলিয়ে বিশ্বনেতাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মঞ্চ।
বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়ন সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে পারে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ হয়তো সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে না, তবে বিশ্বের দেশগুলোকে একই টেবিলে বসিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ তৈরি করাই এর সবচেয়ে বড় শক্তি।

