মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন হোয়াইট হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর এবার আইনি যুদ্ধে নামল দেশটির তিন শীর্ষ সংবাদমাধ্যম সিএনএন, পলিটিকো এবং এমএস নাও (সাবেক এমএসএনবিসি)। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা মামলায় তারা অভিযোগ করেছে, এই নিষেধাজ্ঞা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। তিন প্রতিষ্ঠান যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘গণমাধ্যম কী বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করবে, তা সরকার নির্ধারণ করতে পারে না; এই নীতি রক্ষার জন্য আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি।’ মামলায় নিষেধাজ্ঞাকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে দ্রুত তা স্থগিত করার আবেদন জানানো হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, এই সংবাদমাধ্যমগুলো তার প্রশাসন নিয়ে ‘ধারাবাহিকভাবে ভুয়া খবর’ প্রকাশ করছে। ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘মিডিয়া আউটলেটগুলো যখন প্রেসিডেন্ট, ট্রাম্প প্রশাসন বা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশন করে, তখন তাদের ধারাবাহিকভাবে কল্পকাহিনি ও মিথ্যা লেখা বা রিপোর্ট করা উচিত নয়।’ শনিবার সকালে সিএনএনের সাংবাদিক বেটসি ক্লেইন, এমএস নাওয়ের আকাইলা গার্ডনার এবং পলিটিকোর সাংবাদিক শায়েন হ্যাসলেট হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে গেলে তাদের প্রেস পরিচয়পত্র বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। সিএনএন এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘প্রেস স্বাধীনতার ওপর একটি অবৈধ আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছে।
মামলায় তিন সংবাদমাধ্যম যুক্তি দিয়েছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি শুধু এমন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দ্বারা কভারেজ চান, যারা তার প্রশাসনের প্রশংসা করে। কিন্তু সংবিধান কোনো প্রেসিডেন্ট বা সরকারি কর্মকর্তাকে শুধুমাত্র রিপোর্টের বিষয়বস্তু অপছন্দ করার কারণে সংবাদমাধ্যমকে প্রথম সংশোধনীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অনুমতি দেয় না।’ যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘কোনো ধরনের নোটিশ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আমাদের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র বাতিল করা হয়েছে, কারণ হোয়াইট হাউস আমাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে আপত্তি জানিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার হুমকির মুখে পড়বে।’ মামলার শুনানি বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি শীর্ষ টেলিভিশন নেটওয়ার্ক; এবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স নিউজ ও এনবিসি; হোয়াইট হাউসের ‘টিভি পুল’ কাভারেজ স্থগিত করে। সাধারণত এই পাঁচ নেটওয়ার্ক মিলে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান ও সফরের কাভারেজ পরিচালনা করে এবং সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ভাগাভাগি করে। হোয়াইট হাউস সিএনএনকে এই দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার পর অন্য নেটওয়ার্কগুলোও সংহতির প্রতীক হিসেবে পুল কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ায়। পাঁচ নেটওয়ার্কের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সঠিক ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার অধিকার জনগণের রয়েছে। কোনো প্রশাসনই কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ না হওয়ার কারণে তাদের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়।’ নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টও জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের অনুষ্ঠান থেকে তোলা ছবি অন্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে না।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার কোনো অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুযোগ। মামলার খবর প্রকাশের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন সংবাদমাধ্যমকে ‘তৃতীয় সারির ভাঁড়’ এবং ‘বিকৃত ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংবাদমাধ্যম’ বলে আখ্যা দেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যেসব সংবাদমাধ্যম শুধু নেতিবাচক খবর প্রকাশ করে এবং অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে মিথ্যা ও মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাদের বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’ ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও সংবাদমাধ্যমকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে। হোয়াইট হাউসের সংবাদদাতা সংস্থার সভাপতি ও ফক্স নিউজের সাংবাদিক জ্যাকি হাইনরিখ এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবিলম্বে প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘একটি সংবাদমাধ্যমকে তার কভারেজের কারণে বহিষ্কার করার যে মানদণ্ড তৈরি হলো, তা ভবিষ্যতে যেকোনো সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।’
এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতেরই নতুন অধ্যায়। গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের প্রেস পুলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় ট্রাম্প প্রশাসন, যা আগে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পরিচালনা করছিল হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। একই মাসে ‘গালফ অভ মেক্সিকো’-এর বদলে ট্রাম্পের দেওয়া ‘গালফ অভ আমেরিকা’ নামটি ব্যবহার না করায় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাংবাদিকদের ওভাল অফিস ও এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো সীমিত প্রবেশাধিকারের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করে এপি, যা এখনো চলমান। ট্রাম্প প্রশাসন নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বিবিসিসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এই মামলার ফলাফল শুধু তিন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকারই নয়, বরং মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর ব্যাখ্যা এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

