রাশিয়া ও ইউক্রেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর নতুন একটি সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় যেতে ইউক্রেন প্রস্তুত।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন জেলেনস্কি। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। এসব আলোচনার পর তিনি জানান, যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলা কমানোর বিষয়গুলো বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।
জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন উভয়েই চায় শীতের আগেই রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে। কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে উত্তেজনা কমানোর কিছু পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত, যদি মস্কোও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পানি অবকাঠামোতে আক্রমণ বন্ধ করে।
তিনি বলেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু না করে, তাহলে কিয়েভও রাশিয়ার ডিজেল, তেল পরিশোধনাগার এবং অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না করার বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে।
তবে জেলেনস্কি স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেন একতরফাভাবে রাশিয়ার তেল শিল্পে হামলা বন্ধ করার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠকটি প্রায় ৪০ মিনিট স্থায়ী হয়। জেলেনস্কি এই আলোচনাকে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দুই দেশই যুদ্ধের অবসানের জন্য সম্ভাব্য পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এসব হামলা রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে এবং বিশ্ববাজারে ডিজেলের দামের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়ার তেল পরিশোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার বিষয়টি নিয়ে তিনি জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য সমাধান নিয়েও কথা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না করার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে সেই উদ্যোগের পরও দুই পক্ষের মধ্যে হামলা অব্যাহত থাকে।
জেলেনস্কি একই সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য নতুন হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, ইউক্রেনের কাছে তথ্য রয়েছে যে রাশিয়া নতুন বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের মানুষ প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়।
রাশিয়া ও ইউক্রেন কয়েক মাস ধরে একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা এবং বন্দর অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে বলে কিয়েভ অভিযোগ করে আসছে।
বিশেষ করে শীতকাল ঘনিয়ে আসায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির আশঙ্কা, শীতের সময়ে রাশিয়া আবারও বড় ধরনের হামলা চালিয়ে জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শিল্পকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। দেশটির এসব হামলার লক্ষ্য হচ্ছে রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করা।
২০ সেপ্টেম্বরের একটি হামলার পর মস্কোর একটি তেল পরিশোধনাগারের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে রয়টার্স শিল্প সূত্রের বরাতে জানিয়েছে। ওই স্থাপনায় ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা ছিল।
এদিকে শীতকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়েছে ইউক্রেন। জেলেনস্কি জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শীতের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মজুত থেকে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে জার্মানির সঙ্গে চুক্তির আওতায় পাওয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ দিয়ে তা সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে ট্রাম্প এখনো এই প্রস্তাবে চূড়ান্ত সম্মতি দেননি বলে জানান জেলেনস্কি। একই সঙ্গে ইউক্রেনের নিজস্বভাবে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে তিনি জানান।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের প্রস্তাবকে উত্তেজনা কমানোর একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘাত অব্যাহত থাকলেও জ্বালানি খাত নিয়ে সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়া ও ইউক্রেন এই উদ্যোগকে বাস্তব আলোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কি না।

