প্রায় এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে এবারের সফরের প্রেক্ষাপট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। ২০১৭ সালে যখন তিনি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, তখন চীন প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক প্রভাবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি চাপে ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে শি জিনপিং এমন এক চীনকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, যেটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে শুধু উৎপাদন খাতেই নয়, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
চীনের নিজস্ব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, রোবট, জ্বালানি এবং উন্নত যন্ত্রাংশ উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গত এক বছরে বড় ধরনের বাজারমূল্য অর্জন করেছে। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন সব খাতে প্রতিযোগিতা করছে, যেখানে আগে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ছিল।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বেইজিংভিত্তিক মহাকাশ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে, যা বৈশ্বিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চীনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাগুলোর একটি হলো উৎপাদন সক্ষমতা। দেশটির শিল্প খাত গত বছর প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেল এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চীনের প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ পদার্থের ক্ষেত্রে চীনের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বেইজিংকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে চীন আগের মতো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়। গত কয়েক বছরে দেশটি নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কও সম্প্রসারণ করেছে।
চীনের নীতিনির্ধারণী মহলে এখন একটি ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আর একতরফাভাবে চীনের ওপর শর্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না। সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান উ শিনবো মনে করেন, বর্তমান চীন আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং দুই দেশের সম্পর্ক এখন সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
তবে এই পরিবর্তিত অবস্থান সত্ত্বেও শি জিনপিংয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের অর্থনীতি বর্তমানে বিভিন্ন চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বাড়লেও দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা রয়েছে।
যুব বেকারত্ব সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ খাদ্য সরবরাহ বা পরিবহনভিত্তিক কাজের মতো অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভর করছে। স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের চাপের মুখে রয়েছে এবং আবাসন খাতেও দীর্ঘস্থায়ী সংকট চলছে।
চীনের সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক গতি আগের মতো নেই। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তি খাতে চীনের অগ্রগতি নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসও রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারছে—এটি দেশটির জন্য গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর বড় উদাহরণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া এই প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে গেছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের নতুন প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ নির্ধারিত সময়ের আগেই বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
হুয়াওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্য দেশের প্রযুক্তি সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকা কোনো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়। তাই নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
শি জিনপিংয়ের এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কি না, সেটি বেইজিংয়ের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
চীন চাইছে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হোক। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যু এবং প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো যেন সামগ্রিক সম্পর্ককে আরও খারাপ না করে, সেটি নিয়ে আলোচনা করতে চায় বেইজিং।
গত বছর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যুক্তরাষ্ট্র চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর হুমকি দেয়। এর পর উভয় দেশ সংঘাত কমানোর পথে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দুই দেশই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কঠোর অবস্থান নিলেও উভয় পক্ষকে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
এশিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা অংশীদার কার্ট টংয়ের মতে, দুই দেশের শক্তির ভারসাম্য এমন পর্যায়ে রয়েছে যেখানে কোনো পক্ষের জন্যই একতরফা সুবিধা নেওয়া সহজ নয়।
বিশ্ব রাজনীতিতেও চীনের প্রভাব গত কয়েক বছরে বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত পিউ গবেষণা কেন্দ্রের একটি জরিপে দেখা যায়, ৩৬টি দেশের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ছিল।
চীনের প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সংস্কৃতির বৈশ্বিক বিস্তার দেশটির ভাবমূর্তি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, জনপ্রিয় সংস্কৃতির পণ্য এবং পর্যটন বিশ্বজুড়ে আগ্রহ তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শি জিনপিং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফরের মাধ্যমে চীনের নেতৃত্বের ধারণা তুলে ধরছেন। চলতি মাসের শুরুতে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে তিনি সদস্য দেশগুলোকে স্মার্ট কারখানা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন।
এর আগে মিসর সফরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব দেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর ধারণা তুলে ধরা হয়।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে। চীন ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় এই বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি ইরানের প্রতিনিধির সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠক করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চাইছে যে, আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানে আলোচনাই গুরুত্বপূর্ণ পথ।
সব মিলিয়ে শি জিনপিংয়ের এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেরও প্রতিফলন। এক দশক আগে যে চীন প্রযুক্তি ও বাণিজ্য দ্বন্দ্বে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে ছিল, আজ সেই চীন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও প্রভাবশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা নাকি আরও উত্তেজনার দিকে যাবে—তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক রাজনীতির বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর।

