জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানের প্রতিনিধিদল পৌঁছেছে এমন এক সময়ে, যখন তাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত। কোনো অস্ত্র হাতে নয়, কোনো সেনাবাহিনী সঙ্গে নয়, তারা শুধু কথা আর যুক্তি নিয়ে শত্রুর মাটিতে পা রেখেছেন। এই দৃশ্য এক অসম যুদ্ধক্ষেত্রে একা দাঁড়িয়ে থাকা যোদ্ধার কথা মনে করিয়ে দেয়।
একজন যোদ্ধা যখন যুদ্ধের ময়দানে নামেন, তার হাতে থাকে অস্ত্র। কিন্তু একজন কূটনীতিক যখন শত্রু রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ঢোকেন, তার হাতে থাকে শুধু কথা। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও তার প্রতিনিধিদল সেই অস্ত্রহীন যুদ্ধেই নেমেছেন। তাদের রক্ষাকবচ শুধু জাতিসংঘের সনদ আর নিজের দেশের প্রতি অঙ্গীকার। মনে করিয়ে দেয় বিখ্যাত চীনের কিংবদন্তি সেনাপতি ও রাষ্ট্রকৌশলী গুয়ান ইউ যুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর ভূখণ্ডের গভীরে কূটনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রবেশ করার ঘটনাটি।
ইতিহাসে এমন সাহসের উদাহরণ খুব কম মেলে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ১৯৭৭ সালে ইসরায়েলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সফর ছিল শান্তি আলোচনার অংশ, যুদ্ধ তখন থেমে গিয়েছিল। ইরানের প্রতিনিধিরা কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থাতেই শত্রুর দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এই পার্থক্যই তাদের সাহসকে আরও বড় করে তোলে।
একজন সৈনিক জানে, শত্রুর ঘাঁটিতে ঢুকলে ফিরে আসার নিশ্চয়তা থাকে না। তবু সে দেশের জন্য এগিয়ে যায়। ইরানের কূটনীতিকরাও ঠিক সেই মানসিকতা নিয়ে যাত্রা করেছেন। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ কড়া নজরদারির মধ্যে, তাদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ, তবু তারা পিছপা হননি।
তাদের গণমাধ্যম দলের অনেককে ভিসা দেওয়া হয়নি। বিলাসবহুল পণ্য কেনার অনুমতিও নেই তাদের। যেকোনো জায়গায় যেতে হলে আগে অনুমতি নিতে হয়। এই সব বাধার মধ্যেও তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তেহরান ছাড়ার আগে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, তিনি জাতিসংঘে ইরানি জনগণের দুর্দশার কথা তুলে ধরবেন। এই কথাগুলো বলতে তাকে যেতে হয়েছে সরাসরি প্রতিপক্ষের সামনে। একজন যোদ্ধা যেমন সম্মুখসমরে গিয়ে নিজের পতাকা উঁচিয়ে ধরে, তিনিও ঠিক সেইভাবে নিজের জাতির পতাকা তুলে ধরেছেন শত্রু ভূখন্ডে।
এই সাহস শুধু ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। যুদ্ধের আগুনের মধ্যেও নিজের কণ্ঠস্বর বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ নয়। তবু ইরানের প্রতিনিধিরা সেই কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে।
ইরান জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একটি। বহু দশক ধরে তারা এই অধিবেশনে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এসেছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। যুদ্ধের মধ্যে থেকেও নিজের ঐতিহ্য ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা এক ধরনের অবিচল জাতীয় চেতনার প্রমাণ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আছেন। তিনি বহু বছর ধরে ইরানের কূটনৈতিক লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকেছেন। এবারের সফরেও তিনি সেই একই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। শত্রুর ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে নিজের দেশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা তার জন্যও নতুন এক পরীক্ষা।
সামরিক ইতিহাসে এমন যোদ্ধাদের কথা পাওয়া যায়, যারা সংখ্যায় কম হয়েও শত্রুর ঘাঁটির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা জানতেন, জয় নিশ্চিত নয়। তবু তারা সরে যাননি। ইরানের কূটনীতিকদের এই যাত্রাও সেই একই সাহসের প্রতিচ্ছবি বহন করে।
একদিকে যুদ্ধজাহাজ, নৌ অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞার চাপ। অন্যদিকে একটি ছোট প্রতিনিধিদল, যাদের হাতে নেই কোনো সামরিক শক্তি। তবু তারা আলোচনার টেবিল ছাড়েননি। এই বৈসাদৃশ্যই তাদের সাহসকে আরও স্পষ্ট করে তোলে বিশ্ববাসীর সামনে।
বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে। একটি জাতি যখন যুদ্ধের মধ্যে থেকেও আলোচনার পথ খোলা রাখে, তখন সেটি সাহসের পাশাপাশি প্রজ্ঞারও পরিচয় দেয়। ইরানের এই প্রতিনিধিদল সেই দুটি গুণই একসঙ্গে বহন করছে।
আগামী কয়েক দিন তাদের প্রতিটি বক্তব্য ও পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে গোটা বিশ্বের। তাদের ভাষণ শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়, এটি একটি জাতির সাহসিকতার দলিল হয়ে থাকবে। ইতিহাস হয়তো এই মুহূর্তকে মনে রাখবে সাহসী কূটনীতির একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে।

