জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে নিজের সরকারের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন। তবে তার বক্তব্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে তথ্য যাচাইয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
যুদ্ধ বন্ধ করা, জলবায়ু পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামরিক সক্ষমতা এবং ওয়াশিংটন ডিসির অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প যে তথ্য দিয়েছেন, সেগুলোর কয়েকটি নিয়ে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তথ্য যাচাইকারী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কিছু দাবি অতিরঞ্জিত, কিছু দাবি অসম্পূর্ণ এবং কিছু ক্ষেত্রে উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে।
জাতিসংঘে ট্রাম্প বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি হলো আটটি যুদ্ধ বন্ধ করা।
তিনি যেসব সংঘাতের কথা উল্লেখ করেন, তার মধ্যে ছিল কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড, কসোভো ও সার্বিয়া, রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ভারত ও পাকিস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান এবং গাজা যুদ্ধ।
তবে তথ্য যাচাইয়ে দেখা গেছে, এই আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি নিয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের তালিকায় থাকা অন্তত দুটি ঘটনা প্রকৃত অর্থে যুদ্ধ ছিল না। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার বিষয়টি ছিল একটি বাঁধ প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ, আর সার্বিয়া ও কসোভোর পরিস্থিতিও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছিল না।
এ ছাড়া রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সংঘাত শান্তিচুক্তির পরও পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজা প্রসঙ্গেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও সেখানে হামলা অব্যাহত থাকার তথ্য রয়েছে।
তবে বিশ্লেষণে এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের ইসরায়েল ও ইরানের সংক্ষিপ্ত সংঘাত বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ছিল।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন, তারাই আগে বলেছিলেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে।
তথ্য যাচাইয়ে বলা হয়েছে, এই বক্তব্যের কয়েকটি অংশ বিভ্রান্তিকর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন—দুটি সম্পর্কিত হলেও একই অর্থ বহন করে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলতে মূলত পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়, আর জলবায়ু পরিবর্তন বলতে এর বিস্তৃত প্রভাবগুলোকে বোঝানো হয়।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সময়কালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পায়নের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
তথ্য যাচাইয়ে আরও বলা হয়েছে, পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার পরিবর্তে ঠান্ডা হচ্ছে—এমন দাবির সঙ্গে বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্যের মিল নেই। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময়গুলোর মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কেউ মারা যায়নি—এমন দাবিও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং অতিরিক্ত গরমের কারণে অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
২০১৮ সালের জলবায়ু প্রতিবেদন নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়নি যে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে। বরং বলা হয়েছিল, তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখতে আগামী ১২ বছরের মধ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ট্রাম্প জাতিসংঘে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে।তবে তথ্য যাচাইয়ে এই সংখ্যার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বড় বিনিয়োগ ঘোষণার পরিমাণ ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা ট্রাম্পের বলা ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক কম।
তথ্য যাচাইয়ে আরও বলা হয়েছে, এই হিসাবের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, বাণিজ্য সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক সহযোগিতার ঘোষণাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩২ বিলিয়ন ডলার।
ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অস্ত্র উৎপাদন হচ্ছে।
তথ্য যাচাইয়ে বলা হয়েছে, সামরিক মজুদের সঠিক বর্তমান অবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের পরিদর্শক সংস্থা এবং কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের প্রতিবেদনে কিছু অস্ত্রের মজুদ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগত মজুদের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং অস্ত্র পুনরায় উৎপাদনে শিল্প সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশে ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং মজুদ পুনর্গঠনে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে বলা হয়েছে।তবে প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে কোনো অস্ত্র সংকট নেই।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে এবং ভবিষ্যতে তা ১০০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তথ্য যাচাইয়ে এই সংখ্যার সঙ্গে সরকারি অপরাধ তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পুলিশ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ কমেছে ঠিকই, তবে তা ৮৭ শতাংশ নয়। একই সময়ের তুলনায় মোট অপরাধ প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে বলে তথ্য যাচাইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউস এর আগে অপরাধ কমার বিষয়ে বিভিন্ন শতাংশ উল্লেখ করলেও সেগুলোর ভিত্তি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
রাজনৈতিক বক্তব্যে বড় পরিসরের দাবি সাধারণত জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব দাবি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য, সরকারি পরিসংখ্যান এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের জাতিসংঘের বক্তব্যে যুদ্ধ, অর্থনীতি, জলবায়ু ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। তথ্য যাচাইয়ে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা করাই নীতিনির্ধারণ ও জনসচেতনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

