জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হুমকি, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের জনগণকে নত করা সম্ভব নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলাকে বেআইনি উল্লেখ করে এর তীব্র সমালোচনা করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে পেজেশকিয়ান বলেন, কোনো ধরনের চাপ বা ভয় দেখিয়ে ইরানকে তার অবস্থান থেকে সরানো যাবে না। বরং অতিরিক্ত চাপ জনগণের প্রতিরোধের মনোভাব আরও বাড়িয়ে দেবে।
ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি। পেজেশকিয়ান দাবি করেন, কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের মিনাব এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত শিশুদের ছবি তিনি জাতিসংঘের মঞ্চে প্রদর্শন করেন।
পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল ও বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনার আন্তর্জাতিকভাবে তদন্ত ও বিচার দাবি করেন তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, গত দুই শতাব্দীতে ইরান কোনো দেশের বিরুদ্ধে প্রথমে হামলা চালায়নি। অথচ বর্তমানে তেহরানকেই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তার দাবি, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো তাদের নীতি নয়।
নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে ইরানের অন্য কোনো দেশের অনুমতি প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন পেজেশকিয়ান।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও নিজের দেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকেও দেশটি সরে যাবে না।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথিত দ্বৈতনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার অভিযোগ থাকলেও দেশটির ওপর একই ধরনের পরিদর্শন বা জবাবদিহির চাপ নেই। অথচ ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলার সময়ই দেশটির ওপর সামরিক হামলা চালানো হয়েছে।
গাজা পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের সমালোচনা করেন। পাশাপাশি ইরানের সাধারণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞারও বিরোধিতা করেন তিনি।
ফিলিস্তিন সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের ওপর গভীর ক্ষত হিসেবে উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত ও প্রাণহানির পরও ফিলিস্তিনিদের নিজেদের অধিকার ও আত্মরক্ষার বিশ্বাস শেষ হয়ে যায়নি। নিজের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হলে মানুষ আত্মরক্ষার চেষ্টা করবে—এটিকে মানবিক স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ভাষণের শেষ দিকে পেজেশকিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা, সর্বোচ্চ চাপ কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের জনগণকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং এসব পদক্ষেপ মানুষের প্রতিরোধের মনোভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ইরান সমমর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা ও কূটনীতির জন্য প্রস্তুত। তবে কোনো পক্ষের চাপ বা শক্তির ভাষা তেহরান গ্রহণ করবে না।

