ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তাঁর ভাষণে তিনি গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে এর দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে সানচেজ গাজা পরিস্থিতি নিয়ে স্পেন সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও সামরিক আগ্রাসনের বিষয়ে তাঁর সরকারের অবস্থানের কথাও জানান তিনি।
সানচেজ বলেন, গত আট বছর ধরে ইউক্রেন, লেবানন কিংবা ইরান—যেখানেই আগ্রাসনের ঘটনা ঘটেছে, স্পেন সেসব যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সামরিক শক্তির ব্যবহারকে আন্তর্জাতিক বিরোধ সমাধানের প্রধান উপায় হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই সংকট মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে স্পেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তাঁর সরকার সামরিক ব্যয় বাড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থি আগ্রাসন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গাজা প্রসঙ্গে সানচেজের বক্তব্য ছিল আরও সরাসরি। তিনি বলেন, গাজায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, সেটিকে স্পেন দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা করে। তাঁর ভাষায়, ‘গাজায় নেতানিয়াহু যে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন, স্পেন তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানায়।’
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে স্পেন সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান আবারও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরলেন সানচেজ। বিশেষ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর এমন বক্তব্য ইউরোপের একটি দেশের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে গাজা ইস্যুতে সানচেজের বক্তব্য শুধু নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জানান, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ নিয়েছে তাঁর সরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি কোনো আগ্রাসনের ক্ষেত্রে স্পেনের ভূখণ্ড ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সানচেজের বক্তব্যে মূলত আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পেনের অবস্থানকে একই ধারায় তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলে সংঘাত তৈরি হলে শুধু একটি পক্ষের কর্মকাণ্ডের দিকে না তাকিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। ইসরাইল তার সামরিক অভিযানকে নিরাপত্তা ও হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের বেসামরিক মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাব, হতাহত এবং মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এই বৃহত্তর বিতর্কের মধ্যেই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরলেন।
সানচেজ তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন, লেবানন ও ইরানের প্রসঙ্গও টেনেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, স্পেনের পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাতের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতিগত অবস্থান অনুসরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং আগ্রাসন প্রতিরোধের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে তাঁর সরকার।
বিশেষ করে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি গাজা নিয়ে স্পেনের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে সানচেজ স্পষ্ট করেছেন যে তাঁর সরকার গাজা সংঘাতের ক্ষেত্রে সামরিক সহায়তার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি আগ্রাসনের ক্ষেত্রে স্পেনের ভূখণ্ড ব্যবহার বন্ধের যে কথা তিনি বলেছেন, সেটিও তাঁর সরকারের নীতিগত অবস্থানের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমেও স্পেন আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রকাশ করছে—এমনটাই তুলে ধরেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এখানে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের দেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে বক্তব্য দেন। ফলে গাজা নিয়ে সানচেজের বক্তব্যও কেবল স্পেনের অভ্যন্তরীণ নীতির বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশটির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যখন যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়ে জাতিসংঘে সানচেজের বক্তব্য নতুন করে স্পেনের অবস্থান সামনে আনল। তবে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি সংঘাতের অন্য পক্ষগুলোর অবস্থান ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়নও গাজা পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পেদ্রো সানচেজের বক্তব্যে গাজা ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন, একই সঙ্গে সামরিক আগ্রাসনের বিরোধিতা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার বিষয়ে স্পেনের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গাজা সংকট নিয়ে স্পেনের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

