বিশ্ব যখন একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বিশ্বনেতাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে কি আবারও স্থিতিশীলতার পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সাম্প্রতিক সময়ে সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো যত দ্রুত নিজেদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারবে, ততই তা বিশ্ব শান্তির জন্য ভালো হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে। রাশিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশটির নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার ঘটনায় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার অল্পের জন্য রক্ষা পাওয়ার ঘটনা ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইউরোপে যুদ্ধের প্রভাব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপও দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একসময় বড় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিত কাতারও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া পরিশোধিত জ্বালানির জন্য ভারতের মতো দেশের ওপর নির্ভর করছে। সৌদি আরবও ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে নতুন অংশীদারিত্ব খুঁজছে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পরবর্তী সময়ে তুরস্কের অংশগ্রহণে মক্কা সামরিক সহযোগিতা উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চলমান সংকটের প্রভাবে ভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো দেশই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, বিমান চলাচলে সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উন্নত ও উন্নয়নশীল—সব ধরনের অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেশের জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। একইভাবে সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট এখন আর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা, ইসরাইলের সংশ্লিষ্টতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অবস্থানের কারণে এর প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।
হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ এটি। এই অঞ্চলে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্যের মূল্য—সবকিছুর ওপর চাপ বাড়তে পারে।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডসহ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়লে বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং জ্বালানির দাম দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়—সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ।
আগে অনেক দেশ উত্তরাঞ্চলীয় পরিবহন পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত ছিল। কিন্তু ইরান সংকট এবং বাব এল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অনিশ্চয়তা দেখিয়ে দিয়েছে যে দক্ষিণাঞ্চলীয় পথগুলোও ঝুঁকিমুক্ত নয়।
এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে আস্থা পুনর্গঠন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকট গভীর হয়েছে। অনেক দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে বৃহত্তর বৈশ্বিক সহযোগিতার জায়গা সংকুচিত করছে।
বিশ্বনেতাদের অনেকেই এখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কারণে সীমিত পরিসরে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতাও সামনে রয়েছে—সহযোগিতা ও সমঝোতার বিকল্প হিসেবে যদি সংঘাতই প্রাধান্য পায়, তাহলে বৈশ্বিক ব্যবস্থা আরও বড় সংকটের দিকে যেতে পারে।
জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংঘাত এড়িয়ে শান্তি, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সমঝোতার একটি কাঠামো তৈরি করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে দেশগুলো সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারে।
৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন তাই শুধু আরেকটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়; এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—বিভাজন ও প্রতিযোগিতার পথে এগোবে, নাকি সহযোগিতা ও শান্তির মাধ্যমে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে।
বর্তমান সংকটগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো দেশ একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। জাতিসংঘের এই অধিবেশন সেই সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

