মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার বিমান চলাচল খাত নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশগুলোকে পাল্টা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, যেসব প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে, তাদের বিমানবন্দর ইরানের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে অংশ নেওয়া দেশগুলোর বিমানবন্দর ইরানি ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই হুমকি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানি বিমান সংস্থা, বিদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানের অন্যতম বড় বিমান সংস্থা মাহান এয়ার দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর আগে শুধু মাহান এয়ারের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ করে আরও কয়েকটি ইরানি বিমান সংস্থাকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করেছেন, যেসব বিমানবন্দর বা প্রতিষ্ঠান ইরানি উড়োজাহাজকে জ্বালানি, অবতরণ সুবিধা, টিকিটিং বা অন্যান্য সেবা দেবে, তারাও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এর পর থেকেই ইরানি বিমান সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করতে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব ইরানি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে আজারবাইজান ও জর্জিয়া ইরানি ফ্লাইট স্থগিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এ ছাড়া বাগদাদ ও মাসকাটের সঙ্গে কিছু ফ্লাইট বন্ধ হয়েছে। তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ চালু থাকলেও অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
ইরান কি সত্যিই প্রতিবেশী দেশের বিমানবন্দর অচল করতে পারে?
ইরানের হুমকি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশটি বাস্তবে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো দেশ অন্য একটি স্বাধীন দেশের বিমানবন্দর পরিচালনা করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি অন্য দেশের আকাশসীমা বন্ধ করতে পারে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিমান খাতে চাপ তৈরি করতে পারে। স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, টিকিট বিক্রেতা এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুমকি দিয়ে ইরানি বিমান চলাচল সীমিত করা সম্ভব।
অন্যদিকে, ইরান এর আগেও দেখিয়েছে যে আঞ্চলিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের শুরুতে ইরান কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর এসব দেশের আকাশসীমায় সাময়িক বাধা তৈরি হয়েছিল।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বিমান সংস্থাগুলোকে তাদের কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করতে হয়েছে। দুবাইভিত্তিক এমিরেটস মার্চের শুরুতে সীমিত ফ্লাইট চালু করে, এরপর আবুধাবিভিত্তিক ইতিহাদ এবং কাতার এয়ারওয়েজ তাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে।
তবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরতে এসব বিমান সংস্থার কয়েক মাস সময় লেগেছে।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে সরাসরি হামলার সম্ভাবনা কম
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুৎসাই মনে করেন, ইরান এবার সরাসরি প্রতিবেশী দেশের বিমানবন্দরে হামলা চালাবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম।
তার মতে, তেহরানের হুমকির মূল উদ্দেশ্য হতে পারে প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অংশ নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করা।
তিনি বলেন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশ ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাব কিছুটা সীমিত থাকতে পারে।
তার মতে, সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ ইরানি নাগরিকদের ওপর। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কমে গেলে তারা নিজেদের দেশের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা সরাসরি অনুভব করবেন।
তিনি বলেন, বিমান যোগাযোগ বন্ধ হওয়া আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মতো অদৃশ্য বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের চোখে দ্রুত দৃশ্যমান হয়।
তবে তিনি মনে করেন, শুধু বিমান নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করা সম্ভব হবে না। এটি বরং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের একটি অংশ মাত্র।
ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে ইরানি যাত্রীদের ওপর। বিমান বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ইরান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সক্ষমতা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯ শতাংশ কম ছিল।
সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান থেকে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ আরও সীমিত হয়েছে। ফলে অনেক যাত্রী তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার মতো দেশের স্থল সীমান্ত ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এর প্রভাব শুধু যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের বিমান খাত, পর্যটন এবং আতিথেয়তা শিল্পে যুক্ত হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমান ও পর্যটন খাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ইতোমধ্যে সংঘাতের কারণে পর্যটক ও বিমান চলাচলে ক্ষতির মুখে রয়েছে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কমেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ এখন শুধু বাণিজ্যিক যোগাযোগের বিষয় নয়, বরং এটি বড় ভূরাজনৈতিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের পাল্টা হুমকির ফলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বিমান চলাচল কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের গতিপথ ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর।

