ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণের আগে নিউইয়র্কে তাঁর সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ থেকে শতাধিক মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। পরে আটক সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি)।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে আয়োজিত পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অভিনেতা, রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও অংশ নেন। এনওয়াইপিডি আল জাজিরাকে জানিয়েছে, বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে মোট ১০৩ জনকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁদের সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে আয়োজকদের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে পুলিশের তথ্যের কিছু পার্থক্য রয়েছে। আয়োজকদের দাবি, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে নয়জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচনী প্রার্থী ছিলেন। অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে অন্তত ৩০ জন আটকের কথা বলা হয়েছে।
রয়টার্সের হিসাবে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন, এমি পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডার, ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের এবং নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য চি ওসে।

সড়কে বসে প্রতিবাদ, আটক বিক্ষোভকারীরা
ইহুদি অধিকারকর্মী সংগঠন জুয়িশ ভয়েস ফর পিসের (জেভিপি) উদ্যোগে জাতিসংঘের বাইরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ মানুষ অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অনেকের পরনে ছিল একই ধরনের সাদা টি-শার্ট। সেগুলোতে লেখা ছিল ‘বোমার বদলে মানুষকে অর্থ দাও’, ‘যুদ্ধ নয়’ এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ফার্স্ট অ্যাভিনিউয়ের একটি অংশে বসে পড়েন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ মাইকিং করে তাঁদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
কিছু বিক্ষোভকারী ফুটপাতে সরে গেলেও মূল দলের অনেকে সড়কেই অবস্থান চালিয়ে যান এবং নেতানিয়াহুবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন। পরে পুলিশ তাঁদের একে একে সরিয়ে নেয়। কয়েকজনকে হাত পেছনে জিপ-টাই দিয়ে বেঁধে বাসে তোলা হয়।
গাজায় ইসরায়েলি অভিযান বন্ধের দাবি
বিক্ষোভকারীরা বলেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রতিবাদেই তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন।
নিউইয়র্কের বার্নার্ড কলেজের অধ্যাপক মানিজেহ মোরাদিয়ান বলেন, গাজার পুরো সমাজব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের করের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তাঁদের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিউইয়র্ক ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (এনওয়াইসি-ডিএসএ) ও জেভিপির নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও জানান।

এর আগের দিন এনওয়াইসি-ডিএসএ জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক সরবরাহ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। একই সঙ্গে অতীতে ইসরায়েলে পাঠানো সামরিক সহায়তার চালান সম্পর্কে আরও স্বচ্ছতার দাবিও জানানো হয়।
বিক্ষোভ থেকে আটক দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের বলেন, নেতানিয়াহুর হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে থাকা উচিত, নিউইয়র্কের রাস্তায় কিংবা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নয়।
হাজারো মানুষের পৃথক মিছিল
নেতানিয়াহুর জাতিসংঘ সফরের প্রতিবাদে একই দিনে আরও বড় একটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ফিলিস্তিনিয়ান ইয়ুথ মুভমেন্ট ও দ্য পিপলস ফোরামের আয়োজনে হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দিকে এগিয়ে যান।
আয়োজকদের একজন তাহের দাহলেহ বলেন, নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফর শহরটিতে ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান জানানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্য, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্য
বিক্ষোভের মধ্যেই বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু। গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি এটিকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন।
ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ভাষণে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। তিনি মামদানিকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করে দাবি করেন, মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্কে অনেক ইহুদি আর নিরাপদ বোধ করছেন না।
জবাবে মামদানি অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই নেতানিয়াহু ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বলছেন। তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় মামদানি নিউইয়র্কে নেতানিয়াহু এলে তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, শহরের মেয়র হিসেবে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার আইনগত ক্ষমতা তাঁর নেই।
রয়টার্স জানিয়েছে, নেতানিয়াহু যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন অধিবেশনকক্ষ থেকেও বহু দেশের প্রতিনিধি বেরিয়ে যান।

