দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানের অবসান এবং যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকার মধ্যেই শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। সূত্র: আল জাজিরা
সালাম বলেন, লেবানন যুদ্ধের অবসান চায় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতিকে আরও সুসংহত করতে চায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত পর্যন্ত লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং আটক সব লেবানিজ নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সালামের ভাষণের সময়ও দক্ষিণে হামলা
সালাম যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকায় ইসরায়েলি হামলার খবর পাওয়া যায়।
প্রতিনিধিরা সালামের বক্তব্য শুনছিলেন, এমন সময় তাইবেহ ও দেইর সিরিয়ানের কাছে ইসরায়েলি বাহিনী একটি বড় বিস্ফোরণ ঘটায়। একই সময়ে ফ্রুন ও গান্দুরিয়ার মধ্যবর্তী একটি উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।
ফ্রুন থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক জেইনা খোদর বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সংঘাতের অবসান এখনো অনেক দূরে।
তিনি বলেন, ফ্রুনের আকাশে এখনো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন নিচু দিয়ে উড়তে দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি গোলাবর্ষণের কারণে এলাকায় আগুন জ্বললেও লেবাননের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ও দমকলকর্মীদের সেখানে গিয়ে আগুন নেভানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
খোদর আরও বলেন, দক্ষিণ লেবাননের ৬০টির বেশি শহর এখনো ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্য, লেবানন সরকারের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস করছে।
দক্ষিণে ৪ হাজারের বেশি নিহতের দাবি
২ মার্চ হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪ হাজার ৩৮৬ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৪০৭ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ইসরায়েলি বাহিনী লিতানি নদী পর্যন্ত লেবাননের প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে বলেও জানানো হয়েছে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি কাঠামো চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহার এবং ইসরায়েলি বাহিনী যেসব এলাকা ছেড়ে যাবে, সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

যুদ্ধ শেষ করতে আলোচনার কথা জানালেন সালাম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সালাম জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধের অবসান এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে তার সরকার।
তিনি বলেন, কোনো চুক্তির সাফল্য শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা পূরণ করা হচ্ছে, তার ভিত্তিতেই চুক্তির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।
সালামের মতে, চুক্তিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হলে একটি সুস্পষ্ট সময়সূচি প্রয়োজন। একই সঙ্গে চুক্তির প্রতিটি বিধান বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর যাচাইব্যবস্থাও থাকতে হবে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও জোর দেন। তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব কোনো একটি অঞ্চলে অলঙ্ঘনীয় এবং অন্য কোনো অঞ্চলে আলোচনাযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক আইনের বিধানও কারও জন্য প্রযোজ্য এবং অন্যদের জন্য অপ্রযোজ্য হতে পারে না।
ইসরায়েলি প্রত্যাহারের বিনিময়ে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ
সালাম জানান, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর চূড়ান্ত ও পূর্ণ প্রত্যাহারের বিনিময়ে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ তদারকিতে লেবানন সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়াভাবে রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে। যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কেবল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা উচিত।
এর মাধ্যমে লেবাননের ভেতরে সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করার অবস্থানও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিনি অধিকার ছাড়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নয়
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতার সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের প্রশ্নও সরাসরি যুক্ত বলে মন্তব্য করেন সালাম।
তিনি বলেন, লেবাননে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় যদি পুরো অঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা না থাকে। আর জাতিসংঘ যতদিন ফিলিস্তিনি জনগণকে বিশ্বের অন্যান্য জনগণের মতো তাদের অবিচ্ছেদ্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যেও স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সালামের ভাষায়, এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতার জন্য ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

