ভারতের শিল্পজগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান টাটা গোষ্ঠীতে নতুন করে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গভীর দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছেন দুই শীর্ষ কর্তা, টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা এবং টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ড সভার পর এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে এসেছে। বোর্ড চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর পক্ষে ৪-১ ভোট দিয়েছে, যেখানে একমাত্র বিরোধিতা করেছেন নোয়েল টাটা। একই সভায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশের বিরোধিতা না করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়, যেখানে নোয়েল টাটা আপত্তি জানিয়েছিলেন। টাটা ট্রাস্টস এই সিদ্ধান্তকে ‘আইনগতভাবে অকার্যকর’ বলে দাবি করেছে এবং দুই পক্ষই ইতিমধ্যে আইনজীবী নিয়োগ করেছে। এই বিরোধ এখন শুধু বোর্ডরুমের সীমায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভারতের শিল্পনীতির আলোচনাতেও চলে এসেছে।
টাটা গোষ্ঠীর কাঠামো ভারতের অন্য বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় আলাদা। টাটা ট্রাস্টস হলো গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বড় শেয়ারধারী, যাদের হাতে টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। নোয়েল টাটা এই ট্রাস্টগুলোর চেয়ারম্যান। অন্যদিকে টাটা সন্স হলো টাটা গোষ্ঠীর মূল হোল্ডিং কোম্পানি, যা গোষ্ঠীর বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করে। ফলে টাটা ট্রাস্টসের মালিকানা ও প্রভাব এবং টাটা সন্সের পরিচালন ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোর্ডে টাটা ট্রাস্টসের দুইজন মনোনীত পরিচালক রয়েছেন, নোয়েল টাটা এবং ভেনু শ্রীনিবাসন। টাটা ট্রাস্টসের দাবি, ট্রাস্টের মনোনীত পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন ছাড়া চেয়ারম্যান নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ট্রাস্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দুইজন মনোনীত পরিচালকের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানে দুজনেরই সমর্থন। কিন্তু টাটা সন্সের যুক্তি হলো, ট্রাস্টের অন্য প্রতিনিধিসহ সভাপতির ভোট বিবেচনায় নিলে বোর্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। এই ব্যাখ্যার কোনটি সঠিক, তা শেষ পর্যন্ত আদালতকে নির্ধারণ করতে হতে পারে। এই বিরোধে টাটা সন্স তার অবস্থানের সমর্থনে তিনটি আইনি মতামত পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি উদয় ললিত এবং সাবেক সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি বি এন শ্রীকৃষ্ণ।
চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় মেয়াদের বিষয়টি জটিলতার জন্ম দিয়েছে। গত ১২ আগস্ট তিনি বোর্ডকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি আর নতুন মেয়াদ চাইবেন না। ২০২৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই চিঠির পর টাটা ট্রাস্টস তা গ্রহণ করে এবং গোষ্ঠীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচন কমিটি গঠনের অনুরোধ জানায়। কিন্তু এরপর নমিনেশন অ্যান্ড রিমিউনারেশন কমিটি হস্তক্ষেপ করে এবং চন্দ্রশেখরনকে তাঁর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়। টাটা সন্সের দাবি, চন্দ্রশেখরন বোর্ডের অনুরোধে সেই সিদ্ধান্তে সম্মত হন এবং বোর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাঁকে পুনরায় নিয়োগের প্রস্তাব পাস করে। টাটা ট্রাস্টসের যুক্তি হলো, চন্দ্রশেখরনের আগস্টের চিঠি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, তা বোর্ডের কোনো রেজুলেশনের ফল নয় এবং ট্রাস্ট তা গ্রহণ করেছে। ফলে চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বোর্ডের পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত আইনত টেকসই নয়।
টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কাঠামোয় আরবিআইয়ের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বড় নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নিয়ম করে। এর পর টাটা সন্সকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি সামনে আসে। টাটা সন্স দীর্ঘদিন ধরে এই তালিকাভুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ঋণ পরিশোধ করেছে এবং টাটা ক্যাপিটালকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর আরবিআই টাটা সন্সের সর্বশেষ আইনি আপত্তিও নাকচ করে দেয়। কোম্পানিটি ‘আপার লেয়ার’ এনবিএফসি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তালিকাভুক্তি এখন বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বরের বোর্ড সভায় তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টাটা সন্স জানিয়েছে, তারা আরবিআই, টাটা ট্রাস্টস এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাইবে। তালিকাভুক্তি হলে টাটা ট্রাস্টসের প্রভাব কিছুটা কমতে পারে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ট্রাস্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। তবে এতে চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়, কারণ তার মেয়াদ নিয়ে আইনি বিরোধ বর্তমান গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতেই চলবে।
এই বিরোধে আরেক পক্ষেরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে, তিনি শাপুর মিস্ত্রি। শাপুর প্রয়াত সাইরাস মিস্ত্রির ভাই এবং নোয়েল টাটার শ্যালক। মিস্ত্রি পরিবারের প্রতিষ্ঠান এসপি গ্রুপ টাটা সন্সের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু শেয়ারধারী, যাদের হাতে প্রায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এসপি গ্রুপের বড় ঋণ রয়েছে। তাই টাটা সন্সের এই অংশীদারত্ব বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ রয়েছে মিস্ত্রি পরিবারের। তালিকাভুক্তি হলে এসপি গ্রুপের জন্য সেই পথ সুগম হবে। ১৭ সেপ্টেম্বরের বোর্ড সভায় নোয়েল টাটা এসপি গ্রুপের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার কোটি রুপির বিনিময়ে আংশিক শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যাতে তালিকাভুক্তির বিকল্প একটি পথ তৈরি হয়। কিন্তু বোর্ড সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এসপি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে টাটা সন্সের তালিকাভুক্তির পক্ষে এবং এই তালিকাভুক্তি তাদের জন্য আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
টাটা গোষ্ঠীর এই বিরোধ শুধু একটি ব্যবসায়ী পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ভারতের শিল্পনীতিতেও টাটা গোষ্ঠীর বড় ভূমিকা রয়েছে। টাটা ইলেকট্রনিকসের একটি কারখানা থেকে আগামী বছরের শুরুতে ভারতে তৈরি চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভারতে তৈরি অ্যাপলের আইফোনের প্রায় ৪৬ শতাংশও উৎপাদন করে টাটা। এছাড়া বেসরকারীকরণের পর এয়ার ইন্ডিয়াকে ঘুরে দাঁড় করানোর দায়িত্বও টাটার হাতে। দেশটির অভ্যন্তরীণ আকাশপথের প্রায় এক-চতুর্থাংশে এয়ার ইন্ডিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। সম্প্রতি মুম্বাইয়ে এক অনুষ্ঠানে জেপি মরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন চন্দ্রশেখরনের প্রশংসা করে বলেছেন, এ ধরনের দ্বন্দ্ব বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং এ নিয়ে সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ তাই এখন আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভারতের শিল্পনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। এখন দেখার বিষয়, আদালত এই বিরোধে কী রায় দেয় এবং টাটা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও কাঠামো কেমন হয়।

