জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা বাতিলের দাবি তুলেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তার মতে, বর্তমান ভেটো ব্যবস্থা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির পথে বাধা তৈরি করছে এবং এটি বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এরদোয়ান বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ১৯০টির বেশি দেশের মতামত পাঁচটি দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তা ন্যায়সংগত নয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমানে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এই পাঁচ দেশই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আটকে দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা বা ভেটো ক্ষমতা রাখে।
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৪টি দেশ কোনো প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও, পাঁচ স্থায়ী সদস্যের যেকোনো একটি দেশ ভেটো দিলে সেই প্রস্তাব কার্যকর হয় না।
এরদোয়ান শুধু ভেটো বাতিল নয়, নিরাপত্তা পরিষদের পুরো কাঠামো পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্থায়ী সদস্যপদ বাতিল এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার মতে, বৈশ্বিক সংকট সমাধানের দায়িত্ব কয়েকটি দেশের হাতে সীমাবদ্ধ রাখা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে বাস্তবে ভেটো ক্ষমতা বাতিল করা অত্যন্ত কঠিন। জাতিসংঘ সনদের ১০৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য প্রথমে সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন।
এরপর জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের অনুমোদনের পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সবাইকে তা অনুমোদন করতে হবে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—এই পাঁচ দেশকে নিজেদের ভেটো ক্ষমতা ছাড়তে সম্মত হতে হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে ফ্রান্স ও মেক্সিকো ২০১৫ সালে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়।
এই উদ্যোগটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের স্বেচ্ছাসম্মত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
ফ্রান্স সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ২১টি দেশসহ মোট ১২৮টি দেশ এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেটো পুরোপুরি বাতিলের চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবসম্মত হতে পারে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বজায় রাখার পক্ষে। তবে নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করার বিষয়ে তারা আগ্রহ দেখিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও অতীতে সীমিত পরিসরে নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রসারণের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ভারত, জাপান, জার্মানি, ব্রাজিল এবং আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য নতুন স্থায়ী আসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে নতুন সদস্য যুক্ত করাও সহজ নয়। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের জন্যও পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন।
ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভেটো ব্যবহার করেছে রাশিয়া। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ দেশটি মোট ৩৩১টি ভেটোর মধ্যে ১৬৩টি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভেটো ব্যবহারকারী, দেশটি মোট ৯৫ বার ভেটো দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধসংক্রান্ত প্রস্তাবে রাশিয়াও ভেটো ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তুলনামূলকভাবে কম ভেটো ব্যবহার করেছে। তারা সর্বশেষ ১৯৮৯ সালের পর কোনো ভেটো দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ বাড়লেও পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সম্মতি ছাড়া বড় ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভেটো বাতিলের দাবি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা বড় চ্যালেঞ্জ।

