রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
রোমানিয়ার মিহাইল কোগালনিসিয়ানু (এমকে) বিমান ঘাঁটিটি একসময় এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সেখানে থাকা মার্কিন সেনারা নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ঘাঁটির বিভিন্ন সড়কের নাম রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নামে- অ্যালাবামা, ওহাইও, আলাস্কা এবং জর্জ ওয়াশিংটন।
১৯৯৯ সাল থেকে এই ঘাঁটি মার্কিন সেনাদের আতিথ্য দিয়ে আসছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাও দিয়েছে এটি।
তবে গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়ার পর রোমানিয়ায় থাকা প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সেনা ঘাঁটি ছেড়ে চলে যায়। তাদের অধিকাংশই এই ঘাঁটিতে অবস্থান করতেন।
ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ন্যাটোর সদস্য দেশ রোমানিয়ায় এই সেনা প্রত্যাহার উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ এমকে ঘাঁটিটি ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে রয়েছে, এমন এক সময়ে যখন রাশিয়ার ড্রোন বারবার ন্যাটোর ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু জুলাই মাসে রয়টার্স যখন এমকে বিমান ঘাঁটি পরিদর্শন করে, তখন সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আরও জটিল একটি চিত্র সামনে আসে। ঘাঁটিতে তখন নয়টি মার্কিন কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বিমান মোতায়েন ছিল। ইরান যুদ্ধের সময় এসব বিমান মার্কিন যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই বিমানগুলোর সঙ্গে থাকা পাইলট, ক্রু এবং সহায়ক কর্মীরা আগে চলে যাওয়া সেনাদের কিছুটা ঘাটতি পূরণ করছিলেন। বিষয়টি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, ইউরোপে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এখনো এই অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
দুই মাসেরও বেশি সময় পরও স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কারগুলো ওই ঘাঁটিতেই অবস্থান করছিল।
ন্যাটোর সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব
এই বৈপরীত্যই বর্তমানে ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোটের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর হুমকি দিয়েছেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতে নিঃশর্ত সমর্থন না দেওয়ায় ইউরোপীয় সরকারগুলোর সমালোচনা করেছেন।
তবে ইউরোপে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম নিয়ে রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন একই সময়ে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের জন্য এসব স্থাপনার ওপর নির্ভর করছে।
ন্যাটোর ওপর ট্রাম্পের চাপের প্রভাব মূল্যায়ন করতে রয়টার্স ৫০ জনের বেশি বর্তমান ও সাবেক পশ্চিমা কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, মার্কিন কংগ্রেসের সহযোগী এবং ন্যাটোতে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতরাও ছিলেন।
রয়টার্সের সাংবাদিকরা রোমানিয়া ও এস্তোনিয়ায় ন্যাটোর ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শন করেন এবং নর্থ ক্যারোলাইনার উপকূলে অনুষ্ঠিত ন্যাটোর একটি সামরিক মহড়াও পর্যবেক্ষণ করেন।
এই অনুসন্ধানে এমন একটি জোটের চিত্র উঠে এসেছে, যা বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে, তবে এখনো ভেঙে পড়েনি।
নয়জন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সদস্যদের পাশাপাশি ইউরোপে বড় গ্রাহক থাকা শক্তিশালী মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়া ঠেকাতে পারে।
ট্রাম্প একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
তবে ইউরোপীয় ও মার্কিন কৌশলবিদরা মনে করেন, ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক অবস্থান ৭৭ বছরের পুরোনো এই জোটকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ইউরোপে প্রশ্ন বাড়ছে। এই অনিশ্চয়তা এখন মহাদেশজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয়, অস্ত্র সংগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলছে।
আস্থার সংকটে ন্যাটোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা
সাক্ষাৎকার দেওয়া অনেক কর্মকর্তা আন্তঃআটলান্টিক আস্থার অবনতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি ন্যাটোর প্রধান প্রতিরোধ ব্যবস্থা- অনুচ্ছেদ ৫-এর কার্যকারিতাকে দুর্বল করতে পারে।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইউরোপীয় ও মার্কিন কৌশলবিদরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত ন্যাটো যদি অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কারণ ইউরোপ বর্তমানে পূর্ব সীমান্তে রাশিয়ার মুখোমুখি, যাকে অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, ন্যাটোর সামরিক ব্যয় বাড়লেও অন্তত আটটি সদস্য দেশ- কানাডা, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, স্পেনসহ কয়েকটি দেশ – মার্কিন অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা শুরু করেছে।
এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে উৎসাহিত করার ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা কিছু ক্ষেত্রে উল্টো ফলও তৈরি করতে পারে।
কারণ কিছু মিত্র দেশ এখন মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক প্রযুক্তির বিকল্প খুঁজছে।
মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেসি লিন্টজেনিচ বলেন, ইউরোপের ওপর চাপ কাজ করেছে, তবে এর ফলে প্রকৃত অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপ এখন বেশি অর্থ ব্যয় করছে, প্রতিরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণ করছে- এটি একটি বাস্তব সাফল্য। তবে একই সঙ্গে ইউরোপে এই উদ্বেগও রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ছেড়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের চাপ, ইউরোপে মার্কিন ভূমিকার পুনর্বিবেচনা
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটোর জন্য অন্য যে কারো চেয়ে বেশি কাজ করেছেন। তিনি সবসময় দ্বিধাহীনভাবে আমেরিকার স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।”
যদিও ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কৃতিত্ব ট্রাম্প নিয়েছেন, তবে এর পেছনে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ওই আগ্রাসনে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বহু মানুষ নিহত হয়েছে এবং ইউরোপজুড়ে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ন্যাটোতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকার বলেন, “একটি শক্তিশালী জোটের মিত্ররা একে অপরকে জবাবদিহির মধ্যে রাখে।”
এক বিবৃতিতে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সাম্প্রতিক বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি জোটজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে সহায়তার জন্য ট্রাম্পের প্রশংসা করেন।
তবে ন্যাটোকে নতুনভাবে সাজানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
দুজন মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ন্যাটোর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যাওয়ার আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপে প্রায় ২৫ হাজার মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
এই প্রস্তাবিত সেনা হ্রাসের বিষয়টি এর আগে প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ইউরোপে থাকা মার্কিন সেনার সংখ্যা গত বছর কংগ্রেসে অনুমোদিত ন্যূনতম ৭৬ হাজার সেনার সীমার নিচে নেমে যেত।
তবে হেগসেথ ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর থেকেই প্রতিরোধের মুখোমুখি হন। পরে তিনি ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা নিয়ে উপস্থিত হন।
তিনি জানান, পেন্টাগন ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান নিয়ে ছয় মাসের একটি পর্যালোচনা করবে।
এই পর্যালোচনায় বিশেষভাবে নজরে রাখা হবে এমন দেশগুলোকে, যারা ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তার প্রয়োজনের সময় ‘না’, ‘হয়তো’ অথবা ‘অপেক্ষা করে দেখা’ ধরনের অবস্থান নেয়।
হেগসেথ বলেন, “এটি একটি প্রকৃত পর্যালোচনা হবে। কিছু দেশ ব্যর্থ হবে।”
পেন্টাগন এই পর্যালোচনা নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্সের পর্যালোচনা করা একটি স্মারকের অনুলিপি অনুযায়ী, আগস্ট মাসে পেন্টাগন মিত্র দেশগুলোর জন্য ৫৭টি প্রশ্নের একটি নথি তৈরি করেছিল।
এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের সামরিক, আর্থিক এবং আদর্শগত প্রতিশ্রুতি মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়।
এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল, কোনো দেশ “প্রকাশ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলোকে সমর্থন করেছে কি না।”
মার্কিন স্বার্থ বনাম ইউরোপীয় নিরাপত্তা
এই পর্যালোচনা ওয়াশিংটনের একটি বড় দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে- যুক্তরাষ্ট্র নিজের সামরিক সক্ষমতা কমানো ছাড়াই ইউরোপে তার ভূমিকা কতটা সীমিত করতে পারে।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কংগ্রেস সহযোগী রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ন্যাটো পরিচালনায় হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে দুই দলের মধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে।
তাদের একজন বলেন, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সিনেটররা আশঙ্কা করছেন যে পেন্টাগন এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে, যা ন্যাটো কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক নাও হতে পারে।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজন ব্যক্তির মতে, বাহিনী পর্যালোচনার একটি সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে হেগসেথের জুন মাসের সেই প্রস্তাব- অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার মার্কিন কর্মী কমানো।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ছয় মাসের এই পর্যালোচনার লক্ষ্য হলো “ইউরোপের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষার দিকে অপরিবর্তনীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করা।”
পেন্টাগন এবং হেগসেথ এ বিষয়ে লিখিত মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
তবে পেন্টাগনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “এটি একটি গুরুতর পর্যালোচনা, যা কঠোর, পরামর্শমূলক এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক হওয়ার জন্য পরিকল্পিত।”
ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতির বাস্তব চিত্র
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা সরকারি নিরীক্ষা ও কংগ্রেসের সাক্ষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ৮১ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য রয়েছে।
বিভিন্ন মোতায়েন ও মহড়ার কারণে এই সংখ্যা নিয়মিত পরিবর্তিত হয়।
২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার আগের চার বছরে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে প্রায় ৬৫ হাজার সেনা ও অন্যান্য সামরিক কর্মী ছিল।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭৪ হাজারে পৌঁছায়।
এরপর ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের অধীনে ইউরোপে মার্কিন সেনা সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজারে পৌঁছায়।
২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার সময় এই সংখ্যা কমে বর্তমান পর্যায়ে আসে।
ন্যাটো নিয়ে এই বিরোধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান, জোট এবং বহুপাক্ষিক কাঠামোর পরিবর্তে আরও বেশি লেনদেনমূলক ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই নীতির মাধ্যমে চুক্তি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রয়টার্সের আগের অনুসন্ধানগুলোতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন কূটনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়ও উঠে এসেছে।
সৈন্য এবং আস্থার সংকট
বেশিরভাগ মিত্র দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি মেনে নেওয়ায় জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ন্যাটোর আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলন বড় ধরনের বিরোধ ছাড়াই শেষ হয়।
ট্রাম্প এটিকে “অত্যন্ত সফল” বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে পেন্টাগনের ছয় মাসের পর্যালোচনাই এখন জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে রয়েছে।
কিছু ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, ন্যাটোর সামরিক নেতৃত্ব ইউরোপের দুর্বলতা প্রকাশ না করেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে।
অন্যরা আশঙ্কা করছেন, এই প্রক্রিয়া ওয়াশিংটনের সমর্থন ধরে রাখার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
রোমানিয়া ও পোল্যান্ডের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বজায় রাখতে সতর্কভাবে কিন্তু সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং বুখারেস্টভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘নিউ স্ট্র্যাটেজি সেন্টার’-এর প্রধান জর্জ স্কুটারু বলেন, “এই দেশগুলো কেন নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা চায়? কারণ এটিই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা- একটি মানব ঢাল।”
ইরান যুদ্ধের ঘটনাও দেখিয়েছে, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ইউরোপীয় ভূগোলের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
ইউরোপীয় ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নির্ভরতা
ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইউরোপীয় ভূখণ্ডের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
রয়টার্স জানিয়েছে, মার্চের শেষ দিকে ইতালি মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার আগে সিসিলির সিগোনেলা বিমান ঘাঁটিতে কিছু মার্কিন সামরিক বিমান অবতরণের অনুমতি দেয়নি।
তবে তৃতীয় এক মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ নাগাদ ৫০০টির বেশি মার্কিন সামরিক বিমান ইতালীয় ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে ৩৪৩টি বিমান সিসিলির সিগোনেলা ঘাঁটি এবং ২১১টি বিমান ইতালির উত্তরাঞ্চলের আভিয়ানো ঘাঁটি দিয়ে চলাচল করেছে।
এসব বিমানের অনেকগুলোতেই যুদ্ধাস্ত্র ছিল।
তবুও ২০ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সমালোচনা করে বলেন, “তিনি আমাদের ইতালির অবতরণ ক্ষেত্র বা রানওয়েও ব্যবহার করতে দেননি, যা একটি বড় লজিস্টিক অসুবিধা।”
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ইতালীয় সরকার কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
এই জোটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপজুড়ে সেনা মোতায়েন করতে, প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করতে, সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে এবং গণতান্ত্রিক মিত্রদের একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এর বিনিময়ে ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা সুবিধা পেয়েছে, যা আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে দীর্ঘ সময়ের শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।
তবে ট্রাম্পের অবস্থান এই দীর্ঘদিনের সমঝোতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওয়াশিংটনে দলীয় বিভাজনের বাইরে ন্যাটোর প্রতি সমর্থন ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান এর থেকে ভিন্ন।
তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে- অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার সুবিধা নিচ্ছে, কিন্তু যথেষ্ট অর্থ দিচ্ছে না বলে তার অভিযোগ।
১৯৮৭ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, “অন্যান্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ শোষণ করতে দেখতে দেখতে অনেকেই ক্লান্ত।”
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, মিত্র দেশগুলোকে হয় অর্থ পরিশোধ করতে হবে, নয়তো “বেরিয়ে যেতে হবে।”
তিনি আরও বলেছিলেন, “আর এর ফলে যদি ন্যাটো ভেঙেও যায়, যাক।”
তার প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন।
২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার আগে তিনি এই লক্ষ্য আরও বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার জন্য চাপ দেন।
“যদি তারা অর্থ পরিশোধ না করে, আমি তাদের পক্ষ নেব না,” ২০২৫ সালের মার্চে সাংবাদিকদের বলেছিলেন ট্রাম্প।
প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে নতুন সমীকরণ
ন্যাটোর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো ও কানাডা ২০২৫ সালে তাদের সম্মিলিত জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে।
স্পেন ছাড়া বাকি সব সদস্য দেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও বৃহত্তর নিরাপত্তা-সম্পর্কিত বিনিয়োগে ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যে সম্মত হয়েছে।
সাবেক রিপাবলিকান মার্কিন সিনেটর কে বেইলি হাচিসন, যিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ন্যাটোতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, বলেন, ট্রাম্প মনে করেন রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির নেতাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বেশি সুবিধা পেতে পারে।
তিনি বলেন, “আমি সবসময় চেয়েছি প্রেসিডেন্ট যেন বোঝেন যে, চীন যদি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপক্ষ হয়, তাহলে আমাদের মিত্র প্রয়োজন।”
ন্যাটোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও তার দ্বিতীয় মেয়াদে ইউরোপীয় সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন অব্যাহত রয়েছে।
স্পেনের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প স্পেনকে “ন্যাটোর এক ভয়ঙ্কর অংশীদার” এবং “একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা” হিসেবে সমালোচনা করেছিলেন।
তবে একই সময়ে ওয়াশিংটন স্পেনের রোটা নৌঘাঁটি এবং মোরন বিমান ঘাঁটি থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
শুধু মে ও জুন মাসেই যুক্তরাষ্ট্র আগামী দশকে মোরন ঘাঁটির রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য বিমান সুবিধা শক্তিশালীকরণ এবং স্প্যানিশ কোম্পানিগুলোকে ৪০ কোটি ডলারের নির্মাণ চুক্তি দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
রোটা ও মোরনের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
এই ঘাঁটিগুলো আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ইউরোপে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি “সার্বভৌম সিদ্ধান্ত” এবং স্পেনের সঙ্গে দেশটির সামরিক সম্পর্ক “চমৎকার।”
রোমানিয়া, ব্রিটেন ও মার্কিন ঘাঁটির ভবিষ্যৎ
রোমানিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র মিহাইল কোগালনিসিয়ানু বিমান ঘাঁটির সম্প্রসারণে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।
এর পাশাপাশি রোমানিয়ার অর্থায়নে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প চলছে।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ২০৪০ সালের মধ্যে ঘাঁটিটিকে ইউরোপের বৃহত্তম ন্যাটো বিমান ঘাঁটিতে পরিণত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে সর্বোচ্চ ২০ হাজার কর্মী অবস্থান করতে পারবেন।
ইরানের ওপর মার্কিন হামলায় ব্রিটেনের সীমিত সমর্থনের জন্য ট্রাম্প মার্চ মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করেছিলেন।
তবে ঘাঁটির অবকাঠামো পরিচালনাকারী একটি মার্কিন বিমান বাহিনী ইউনিটের মার্চ মাসের উপস্থাপনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের সাতটি বিমান ঘাঁটিতে চলমান ও আসন্ন প্রকল্পে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করছে।
মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ব্রিটিশ ঘাঁটির অন্তত একটি ব্যবহার করে ইরানি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।
এটি দেখায় যে ইউরোপ এখনো মহাদেশের বাইরে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার পরীক্ষা ও ন্যাটোর উদ্বেগ
ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অন্তত এক ডজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন যে, ন্যাটোকে দুর্বল করতে ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
তাদের মতে, শুধু ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের নেতিবাচক বক্তব্যই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এই বার্তা দিতে পারে যে পশ্চিমা জোট বিভক্ত এবং প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল।
ওই কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পুতিন ইউরোপজুড়ে ধারাবাহিক অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনার মাধ্যমে এই ধারণা পরীক্ষা করছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলো এসব ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে।
এর মধ্যে আগস্ট মাসে জার্মানির একটি বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার চেষ্টা এবং পোল্যান্ডের একটি ড্রোন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে।
জুলাই মাসে রয়টার্স রোমানিয়ার এমকে বিমান ঘাঁটি পরিদর্শনের মাত্র দুই দিন পর ন্যাটো রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি রুশ ড্রোন প্রতিহত করতে যুদ্ধবিমান পাঠায়।
অন্য একটি ঘাঁটি থেকে পরিচালিত রোমানিয়ার একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সেটিকে গুলি করে ভূপাতিত করে।
এর পরবর্তী দিনগুলোতে আরও দুটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়, যেগুলোকেও রুশ বলে মনে করা হয়।
জুলাইয়ের শেষ দিকে ন্যাটোর আরেক সম্মুখসারির সদস্য পোল্যান্ডে একটি রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
জার্মানি, পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে বেলজিয়ামে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস গনচার রাশিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি ঘটনাগুলোকে ইউক্রেন ও অন্য পক্ষগুলোর পরিচালিত “নোংরা উস্কানি” হিসেবে উল্লেখ করেন, যাদের উদ্দেশ্য “ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে টেনে আনা।”
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এসব ঘটনার জন্য মস্কোকে দায়ী করছেন।
তাদের মতে, এগুলো ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন দুর্বল করা এবং ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
ইউরোপ ও কানাডার অস্ত্র কৌশলে পরিবর্তন
ন্যাটো জোটের সদস্য দেশগুলো এখন আর ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় নেই। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির বিকল্প খুঁজছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ন্যাটো নিয়ে হুমকি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ- এই দুই বিষয় একসঙ্গে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
ন্যাটোর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো এবং কানাডা ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে।
ট্রাম্প মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক সুবিধার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেন, “আমরা এটি তৈরি করব এবং এর জন্য তারাই অর্থ দেবে। আমরা প্রচুর অর্থ পেতে চলেছি।”
এক বছর পর আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেন, মিত্র দেশগুলো ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “তারা সবাই আমেরিকান-নির্মিত সরঞ্জাম চায়।”
তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ন্যাটোর ৩২ সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত আটটি দেশ- কানাডা, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, স্পেন, নরওয়ে, তুরস্ক, ফ্রান্স এবং জার্মানি- মার্কিন অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমর্থনের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ বিষয়ক সাবেক সহকারী মহাসচিব ওয়েন্ডি গিলমোর বলেন, এই ধরনের সন্দেহ অপ্রত্যাশিত নয়।
তার মতে, অনেক ইউরোপীয় দেশ ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনের সময় বিষয়টিকে একটি সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখেছিল এবং ধরে নিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতোই নির্ভরযোগ্য মিত্র থাকবে।
তিনি বলেন, “দ্বিতীয় নির্বাচনটিকে আরও বেশি পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে এবং মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র আর সেই ব্যতিক্রমী গণতন্ত্র নয়, যা আমরা সবাই ভাবতাম।”
মার্কিন প্রযুক্তির বিকল্প খুঁজছে মিত্ররা
যদিও ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উন্নত সামরিক প্রযুক্তির বিকল্প তৈরি করতে সক্ষম নয়, তবুও কানাডা ও পোল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর কয়েক দশকের নির্ভরতা কমানোর জন্য নতুন সরঞ্জাম কিনছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে রাডার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম।
এর ফলে পেন্টাগনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে পেন্টাগনের শীর্ষ নীতি উপদেষ্টা এলব্রিজ কোলবি বলেন, মিত্র দেশগুলোর উচিত মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতা করা, “ব্যর্থভাবে অনুকরণ বা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা না করা।”
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধে থাকা কানাডা ন্যাটোর ভেতরে পরিবর্তিত সম্পর্কের একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি পদত্যাগ করা তিনজন জ্যেষ্ঠ কানাডীয় সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনার বিষয়ে কানাডা পেন্টাগন থেকে পরস্পরবিরোধী বার্তা পেয়েছে।
জুন মাসে কানাডা একটি মার্কিন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ট্রেলীয় আর্কটিক রাডার ব্যবস্থা বেছে নেয়।
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একজন সাবেক কানাডীয় কর্মকর্তা বলেন, পেন্টাগন এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল।
কারণ অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় কয়েক বছর দ্রুত এই ব্যবস্থা সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে সুইডেন থেকে আগাম সতর্কীকরণ রাডার বিমান কেনা এবং অতিরিক্ত মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে সুইডেনে তৈরি কিছু গ্রিপেন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি বিবেচনা করায় পেন্টাগনের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রয়টার্স আগে জানিয়েছিল, এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন- উত্তর আমেরিকার পারস্পরিক প্রতিরক্ষায় কানাডা একটি “বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার” কি না।
এক বিবৃতিতে কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বছর প্রথম দফায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার পর আরও বিমান কেনা হবে কি না, অথবা বিকল্প খোঁজা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
মন্ত্রণালয় বলেছে, “কানাডার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার কাজ চলমান থাকায় এফ-৩৫ পর্যালোচনাও অব্যাহত রয়েছে।”
মার্কিন অস্ত্র নির্ভরতা কমানোর ঝুঁকি
মার্কিন অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার গুরুতর প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করেন নেদারল্যান্ডসের সাবেক অস্ত্র সংগ্রহ ও কর্মী বিষয়ক মন্ত্রী গিজ টুইনম্যান।
তিনি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন।
টুইনম্যান বলেন, ইউরোপে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব শেষ পর্যন্ত কিছু সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ব্যবসা হারাতে পারে।
টুইনম্যান বলেন, “ঝুঁকিটা বিশাল। আসলে এটি ঘটার দ্বারপ্রান্তে।”
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য পণ্যের জন্য “ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে প্রবল চাহিদা” দেখতে পাচ্ছে।
পেন্টাগনের বাজেট নথি অনুযায়ী, পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড চলতি বছর প্রথমবারের মতো এফ-৩৫ পাবে। এরপর কানাডা ও জার্মানিও এই যুদ্ধবিমান পাবে।
বেলজিয়ামে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস গনচার বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকে ব্যয়বহুল মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য উৎসাহিত করতে রাশিয়ার হুমকিকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।
তবে কয়েক দশকের মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা থেকে ইউরোপকে দ্রুত আলাদা করা সম্ভব নয়।
নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে।
বেশিরভাগ আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করতেও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।
তবুও অনেক ইউরোপীয়, মার্কিন এবং কানাডীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা মার্কিন প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভরতাকে ইউরোপের জন্য ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনায় পরিবর্তন
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইউরোপে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ক্রিস চিভিস বলেন, “আমি মনে করি না যে কোনো দায়িত্বশীল ইউরোপীয় নেতা তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে পারেন।”
তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে যা করে এসেছে, এখন সেখানে একটি বড় পরিবর্তন আসছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনও সাম্প্রতিক এক ভাষণে এই পরিবর্তিত মনোভাব তুলে ধরেছেন।
তার বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’ ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে “আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় ফাটল” নিয়ে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, ইউরোপকে “অবিলম্বে আমাদের অংশীদারিত্বকে নতুন করে ভাবতে হবে।”
এরপর তিনি কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম “সহযোগী সদস্য” হওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
এটি প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ওই ভাষণে উপস্থিত থাকা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শেষে দাঁড়িয়ে সম্মাননা গ্রহণ করেন।
ইউরোপের বিদ্রোহ
প্রকাশ্যে ইউরোপীয় সরকারগুলো এখনো ন্যাটোর প্রতি আস্থা প্রকাশ করে চলেছে।
রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেওয়া চারটি সরকার- পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি এবং স্পেন-বলেছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও ন্যাটো ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
নরওয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে “আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে পর্তুগাল বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটো কল্পনা করা যায় না।
জার্মানির ফেডারেল পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, জার্মানির সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো মার্কিন ঠিকাদারদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
তবে অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, ন্যাটোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হলে রাশিয়া ও অন্যান্য প্রতিপক্ষকে বিশ্বাস করতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে রক্ষা করবে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, অনেক ইউরোপীয় নাগরিক সন্দেহ করছেন যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে ইউরোপের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে কি না।
একই সঙ্গে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবও বেড়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুলাই মাসের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৩৬টি দেশের বেশিরভাগে চীনকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়।
এর মধ্যে ন্যাটোর নয়টি সদস্য দেশ রয়েছে- কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন এবং তুরস্ক।
সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট এবং সিনেট ন্যাটো পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীর সহ-সভাপতি জেন শাহিন বলেন, “তারা আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একজন নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখছে না।”
ন্যাটো কি পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ নতুন ধরনের অস্ত্র ব্যবস্থা পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এবং উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার (ন্যাটো) সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—জোটটি কি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?
পাঁচজন ইউক্রেনীয় ও পশ্চিমা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে ন্যাটোর কিছু অস্ত্র ব্যবস্থা ও সামরিক কৌশল অপ্রচলিত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য না হওয়ায় দেশটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে ন্যাটো বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থা কেনা, উন্নয়ন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর এমনকি কয়েক দশক সময় নেয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি কঠোর অবস্থানের কারণে ন্যাটোর অনেক সদস্য দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে।
একই সময়ে পেন্টাগন ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করছে।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণ করছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত সামরিক অভিযানে পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ড্রোন বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের ধরন
ইউক্রেনের অন্যতম বড় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের সহ-মালিক এবং প্রধান ডিজাইনার ডেনিস স্টিলারম্যান বলেন, আধুনিক যুদ্ধে প্রচলিত ট্যাঙ্কের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ৫ হাজার ডলার মূল্যের একটি ড্রোন দিয়েই একটি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করা সম্ভব।
তার ভাষায়, ট্যাঙ্ক এখন “মূল্যহীন” হয়ে পড়েছে।
তবে ইউরোপ এখনো ট্যাঙ্কের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
অনেক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধেও ট্যাঙ্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে সস্তা ড্রোন যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে।
বড় আকারের সেনাদল কিংবা বিপুল যানবাহনের বহর এখন অনেক সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইউক্রেনের ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার ওলেক্সান্ডার পিভনেনকো বলেন, গত বছর তার ইউনিটের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়া আন্তর্জাতিক সেনাদের বিষয়ে তিনি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন।
তিনি বলেন, “তারা অবস্থান আক্রমণ করতে পারদর্শী। কিন্তু যদি মাথার ওপর একটি ড্রোন থাকে এবং আপনি উপরে না তাকানও, তাহলে আপনার দলের কী হবে বলে আপনি মনে করেন?”
ন্যাটোর মহড়ায় পুরোনো ধারণার চ্যালেঞ্জ
জুন মাসে রয়টার্স এস্তোনিয়ার পালদিস্কির কাছে অনুষ্ঠিত একটি ন্যাটো সামরিক মহড়া পর্যবেক্ষণ করে।
এস্তোনিয়া একটি ছোট বাল্টিক দেশ, যা বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে থাকা ২১০ মাইল দীর্ঘ সীমান্তকে শক্তিশালী করছে।
এই মহড়ায় মার্কিন ও ইউরোপীয় সেনারা যুদ্ধকালীন ফিল্ড হাসপাতালে কয়েক ডজন কৃত্রিম আহত ব্যক্তির চিকিৎসা করেন।
তবে মহড়াটি এমন একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় যে, ন্যাটো হাসপাতালগুলোর ওপরের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
কিন্তু সস্তা, গোপনীয় এবং দীর্ঘপাল্লার ড্রোনের যুগে এই বিষয়টি আর নিশ্চিত নয়।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এখন ইউক্রেন শুধু ন্যাটোর প্রশিক্ষণ ও সহায়তা গ্রহণকারী দেশ নয়, বরং যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জোটকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে তারা মনে করেন, ন্যাটোর সামরিক আমলাতন্ত্র এই পরিবর্তনগুলো দ্রুত গ্রহণ করতে পারছে না।
রোমানিয়ায় ন্যাটোর মনস্তাত্ত্বিক অভিযান প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, জোটের কিছু প্রশিক্ষণ উপকরণ এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে।
ন্যাটোর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্র নিয়ে কর্মকর্তাদের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটি কোনো মন্তব্য করেনি।

আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় দুর্বলতা
ইউক্রেন যুদ্ধ ন্যাটোর এমন একটি দুর্বলতাও সামনে এনেছে, যার সমাধান আরও কঠিন বলে মনে করছেন জোটের কর্মকর্তারা।
এটি হলো আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলা মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ইউরোপের নির্ভরতা স্পষ্ট করেছে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা প্রথম ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইউক্রেনে বর্তমানে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শত্রুর নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্যান্য আকাশীয় হুমকি ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়।
প্যাট্রিয়টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে- এই আশঙ্কায় ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে।
ইউক্রেন নতুন ফরাসি-ইতালীয় SAMP/T-NG আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অপেক্ষায় রয়েছে।
এই ব্যবস্থা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ফ্রান্স ইউক্রেনে এই ব্যবস্থা মোতায়েন দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা আগে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, এটি আগামী বসন্তের মধ্যে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।
ইউক্রেন-ইউরোপের নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেন ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সেনাদের একে অপরের কাছ থেকে শেখার অনেক সুযোগ রয়েছে।
মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের ড্রোন ও রেডিওইলেকট্রনিক যুদ্ধ কৌশলকে “বিশ্বব্যাপী অতুলনীয়” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
একই সঙ্গে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রচেষ্টারও প্রশংসা করেছে।
জুলাই মাসে ইউক্রেন এবং নয়টি ইউরোপীয় মিত্র দেশ একটি বিমান প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে।
এই জোটের মধ্যে যৌথভাবে নতুন অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘ফ্রেয়া’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পে প্রায় এক ডজন কোম্পানি যুক্ত রয়েছে।
এতে ফায়ার পয়েন্ট প্রধান বেসরকারি অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো প্যাট্রিয়টের তুলনায় কম খরচে এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য একটি ব্যবস্থা তৈরি করা।
একই সঙ্গে নিশ্চিত করা যে এর উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
ফায়ার পয়েন্টের প্রধান ডিজাইনার ডেনিস স্টিলারম্যান বলেন, “যদি আপনি আপনার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন, তাহলে আপনার নিরাপত্তায় অবশ্যই স্বনির্ভর হতে হবে।”

