শীত আসার আগেই দূষণের বিরুদ্ধে কড়া প্রস্তুতি নিল দিল্লি। আগামী ১ নভেম্বর থেকে সরকারি ও বেসরকারি অফিসের অর্ধেক কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করতে হবে। বৈধ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ ছাড়া কোনো গাড়ি জ্বালানি পাবে না। দিল্লির বাইরের যেসব গাড়ি বিএস-সিক্স মান পূরণ করে না, সেগুলোর রাজধানীতে ঢোকাও সীমিত হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ায় শীতকালীন বায়ুদূষণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বৈঠক করেছে ভারত সরকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনের সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সভাপতিত্বে বৈঠকে ছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী মণিন্দর সিরসা এবং বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঘোষিত পরিকল্পনার বেশির ভাগ বিধিনিষেধ ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় তিন মাস চলবে। এই সময়ে অনুমোদিত পার্কিং এলাকায় ফি দ্বিগুণ হবে। তবে দিল্লি মেট্রোরেল কর্পোরেশনের নিজস্ব মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার পার্কিংয়ে এ নিয়ম খাটবে না। বেশি ফি নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো এবং গণপরিবহনে উৎসাহ দেওয়াই এর উদ্দেশ্য বলে মনে হয়। মেট্রোকে ছাড় দেওয়ার পেছনেও সেই যুক্তি কাজ করছে বলে ধরে নেওয়া যায়, যদিও প্রতিবেদনে এর ব্যাখ্যা নেই।
গাড়ির ধোঁয়া কমাতে চালু হচ্ছে ‘দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ ছাড়া জ্বালানি নয়’ নামের অভিযান। বৈধ সনদ না থাকলে গাড়িতে জ্বালানি দেওয়া হবে না। স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বসানো দিল্লির ৫০০টি জ্বালানি স্টেশনে এ নিয়ম কার্যকর হবে। বৈঠকে জানানো হয়, গত ১২ মাসে ওই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৫৫টি বিএস-থ্রি ও আয়ুষ্কাল পেরোনো পুরোনো গাড়ি ধরা পড়েছে। এই সংখ্যা দুই দিক থেকে ভাবার মতো। প্রযুক্তি কাজ করছে, এটি তার প্রমাণ। আবার এত পুরোনো গাড়ি রাস্তায় চলছিল, এটিও একটি ইঙ্গিত। তবে ধরা পড়ার পর এসব গাড়ির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় সোমবার জানিয়েছে, নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পেরোনো গাড়িতে জ্বালানি স্টেশন থেকে আর জ্বালানি দেওয়া হবে না। পেট্রলচালিত গাড়ির আয়ু ১৫ বছর, ডিজেলচালিত গাড়ির ১০ বছর। তবে এই নিয়ম কবে থেকে কার্যকর হবে, তা কার্যালয় নির্দিষ্ট করে জানায়নি। ফলে এটি এখনো ঘোষণার পর্যায়ে আছে। কার্যকর হওয়ার তারিখ না জানালে এর প্রভাব মাপা যাবে না।
নির্মাণ খাতে বিধিনিষেধ তুলনামূলক কঠোর। ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের নির্মাণ ও ভাঙার কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এর আগে, ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ধুলা তৈরি করে এমন ভাঙার কাজ এবং খোলা জায়গার সাধারণ নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হবে। অর্থাৎ শীতের সবচেয়ে দূষিত সময়টিতে দুই ধাপে নির্মাণ থামানো হচ্ছে। নির্মাণশ্রমিক ও ঠিকাদারদের আয়ে এর প্রভাব কেমন হবে এবং তাঁদের জন্য কোনো সহায়তার ব্যবস্থা আছে কি না, প্রতিবেদনে সে তথ্য নেই।
অফিসের সময়সূচিও ভাগ করা হয়েছে, যাতে একসঙ্গে সবাই রাস্তায় নেমে যানজট ও ধোঁয়া না বাড়ান। দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের অফিস চলবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দিল্লি সরকারের অফিস চলবে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত।
রাস্তা সংস্কারে এবার বড় লক্ষ্য ধরা হয়েছে। গত তিন বছরে বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার সড়ক সংস্কার হয়েছে। ২০২৬ সালের লক্ষ্য ৩ হাজার ৬৫ কিলোমিটার, অর্থাৎ আগের গড়ের প্রায় তিন গুণ। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ কিলোমিটারের, যা লক্ষ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। বাকি ১ হাজার ৮৭২ কিলোমিটার। সিমেন্ট-কংক্রিটের কাজ ৩১ অক্টোবর এবং বিটুমিনের কাজ ১৫ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য আছে। হিসাব করলে বাকি সময়ে গড় গতি আগের যেকোনো বছরের চেয়ে অনেক বেশি করতে হবে। ভাঙা রাস্তা ধুলার বড় উৎস, তাই সময়মতো কাজ শেষ না হলে শীতের ধুলা সামলানো কঠিন হবে। লক্ষ্য পূরণে কী ধরনের সম্পদ বা ঠিকাদার নিয়োগ হচ্ছে, তা প্রতিবেদনে নেই।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংখ্যাগুলো আরও স্পষ্ট চিত্র দেয়। দিল্লিতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রক্রিয়াজাত হয় ৭ হাজার ৬৪২ টন, যা প্রায় ৫৭ শতাংশ। বাকি প্রায় ৫ হাজার ৮৫০ টন প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে না। অক্টোবরের মধ্যে নতুন ব্যবস্থায় আরও ৫ হাজার ৯০০ টন প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অঙ্ক মিললে কাগজে-কলমে বর্জ্যের পুরোটাই সামলানো সম্ভব। তবে এটি সক্ষমতার হিসাব, বাস্তব ফল নয়। আর সক্ষমতা তৈরি হওয়া এবং প্রতিদিন তা পুরোপুরি কাজে লাগানো এক কথা নয়। বর্জ্য পোড়ানো ও ধুলার সঙ্গে দূষণের সম্পর্ক থাকায় এই লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ। যান্ত্রিকভাবে সড়ক পরিষ্কারের গাড়ির সংখ্যাও ২০২৫ সালের ৭৬ থেকে বাড়িয়ে ৯৮ করা হয়েছে।
শিল্পকারখানার দিকে নজরদারি বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে নজরদারি ও নিয়ম প্রয়োগ জোরদার করা হবে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৭ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয়েছে, যা প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি। গঠন করা হয়েছে ৩৩৪টি প্রয়োগকারী দল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ২৭১টি কারখানায় জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে দূষণকারী ২ হাজার ২৮৩টি কারখানা বন্ধ বা সিলগালা করা হয়েছে। অর্থাৎ জরিপ করা প্রতি পাঁচটি কারখানার একটির বেশি নিয়ম ভেঙেছে। এই হার বলে দেয়, শিল্প দূষণ সেখানে বড় সমস্যা। আবার এত কারখানা বন্ধ করা প্রয়োগের গুরুত্বও দেখায়। কতগুলো বন্ধ কারখানা পরে আবার চালু হয়েছে, সে তথ্য নেই।
নাগরিকদের ভূমিকাও পরিকল্পনায় আছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সাপ্তাহিক পরিদর্শন হবে। স্থানীয় দূষণ নিয়ে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকবে। নাগরিকদের পরামর্শ নিতে চালু হবে নতুন পোর্টাল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বায়ুমান সূচক প্রকাশ করা হবে। আর ‘এয়ারশেড’ বা বায়ু অঞ্চলভিত্তিক পদ্ধতিতে জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বায়ু তো প্রশাসনিক সীমানা মানে না। দিল্লির বাতাস পাশের শহর ও রাজ্যের দূষণেও প্রভাবিত হয়। তাই এই আঞ্চলিক সমন্বয় সবচেয়ে কঠিন, আবার সবচেয়ে জরুরিও।
ভূপেন্দ্র যাদব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, বায়ুর মান উন্নয়নে নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, সমন্বিত প্রয়োগ, নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও নিয়মিত পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘোষণার একটি লক্ষণীয় দিক হলো পুনরাবৃত্তি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতি শীতেই দিল্লিকে জরুরি ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এটি বোঝায়, সমস্যার মূল কারণ এখনো দূর হয়নি। কর্মী ঘরে বসিয়ে কাজ করানো বা নির্মাণ বন্ধ রাখা সাময়িক উপশম, স্থায়ী সমাধান নয়। যেসব সংখ্যা এসেছে, যেমন সড়ক সংস্কারের তিন গুণ লক্ষ্য বা বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের নতুন সক্ষমতা, সেগুলো স্থায়ী কাঠামো গড়ার চেষ্টা। কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে আসছে, তা শীতের বাতাসের মানেই বোঝা যাবে। আগের দুই বছরের ব্যবস্থার ফলাফল কী ছিল, বায়ুমান কতটা উন্নত হয়েছিল, সে তথ্য প্রতিবেদনে না থাকায় এই পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর, তা মাপা যাচ্ছে না।
পরিবেশবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ডের ভারতবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা হিশাম মুন্ডোল দ্য হিন্দুকে বলেছেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত সারা বছর নির্মল বাতাস নিশ্চিত করা। এ জন্য পরিবহন, শিল্পকারখানা, নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর বিষয়ে ধারাবাহিক ব্যবস্থা দরকার। তাঁর মতে, পরিকল্পনা শুধু দিল্লিকে ঘিরে নয়, পুরো অঞ্চলকে বিবেচনায় নিয়ে করা উচিত। এই বক্তব্যই আসলে বর্তমান পরিকল্পনার মূল দুর্বলতা ধরিয়ে দেয়। ঘোষিত বিধিনিষেধ মূলত শীতের তিন মাসের জন্য, আর ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর প্রসঙ্গ প্রতিবেদনের পরিকল্পনায় আসেনি। অথচ আঞ্চলিক দূষণের বড় একটি উৎস সেটিই বলে বিশেষজ্ঞেরা প্রায়ই মনে করেন। এখানে প্রতিবেদনে ঠিক এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই, তাই দিল্লির নতুন পরিকল্পনা এটি কীভাবে সামলাবে, তা বলা যাচ্ছে না।
কর্মীদের ঘরে বসে কাজের ব্যবস্থার সামাজিক-অর্থনৈতিক দিকও আছে। অফিসে গিয়ে কাজ করতে হয় না, এমন পেশাজীবীদের জন্য এটি সহজ। কিন্তু দোকানদার, পরিবহনকর্মী, নির্মাণশ্রমিক বা সেবা খাতের কর্মীরা ঘরে বসে কাজ করতে পারেন না। তাঁরাই আবার দূষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। আর নির্মাণ বন্ধ থাকলে তাঁদের আয়ও কমে। প্রতিবেদনে এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থার কথা নেই। তাই পরিকল্পনাটি পরিবেশের দিক থেকে কড়া হলেও এর সামাজিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
সব মিলিয়ে দিল্লির প্রস্তুতি বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট। নজরদারি প্রযুক্তি, কারখানা অভিযান, সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ, সবই এতে আছে। তবে সাফল্য মাপার তিনটি সূচক এখন নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, ৩১ অক্টোবর ও ১৫ নভেম্বরের সময়সীমার মধ্যে সড়ক সংস্কারের বাকি ১ হাজার ৮৭২ কিলোমিটার শেষ হয় কি না। দ্বিতীয়ত, পুরোনো গাড়িকে জ্বালানি না দেওয়ার নিয়ম কবে ও কীভাবে কার্যকর হয়। তৃতীয়ত, শীতের মাসগুলোতে বাতাসের মান আগের দুই বছরের চেয়ে ভালো হয় কি না। এই তিনটির উত্তরেই বোঝা যাবে, এবারের পরিকল্পনা সত্যিই আগের পুনরাবৃত্তি ভেঙে নতুন কিছু করতে পারছে কি না।

