অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর টাউনসভিলে সামরিক মহড়ার দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে এটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। চারদিকে গুলির শব্দ, আকাশে উড়ছে ড্রোন, দূরে দেখা যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়া, আর আকাশে টহল দিচ্ছে সামরিক হেলিকপ্টার। আধুনিক যুদ্ধের প্রস্তুতির মতো সব আয়োজন থাকলেও এটি কোনো সংঘাতের জায়গা নয়, বরং একটি বড় সামরিক অনুশীলন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টাউনসভিলে আর কোনো বড় সামরিক সংঘাত দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া মনে করছে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত থাকা জরুরি।
অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার বেন ম্যাকলেনান বলেন, বিশ্ব এখন একটি অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই এমন একটি সেনাবাহিনী তৈরি করা প্রয়োজন, যা অতীতের তুলনায় সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে পারে।
একসময় বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের সংঘাতের প্রভাব যেমন জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতেও পড়েছে, তেমনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া তার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করছে। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের কূটনৈতিক জটিলতা। কারণ চীন শুধু সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নয়, একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারও।
নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র, অর্থনীতিতে চীন
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অবস্থানকে অনেকেই একটি “বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা” বা দ্বৈত সম্পর্ক হিসেবে দেখছেন। একদিকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
টাউনসভিলে অনুষ্ঠিত “সাউদার্ন জ্যাকারু” নামের সামরিক মহড়াটি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ। এর লক্ষ্য হলো ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সমন্বয় বৃদ্ধি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন সেনা কেভিন হিকস বলেন, তারা নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী হিসেবে দেখতে চান।
গত এক দশকে অস্ট্রেলিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও বেড়েছে। ২০১২ সালে যেখানে অল্প সংখ্যক মার্কিন সেনা অস্ট্রেলিয়ায় ছয় মাসের জন্য মোতায়েন হতো, বর্তমানে সেই সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় শক্তির প্রতিযোগিতা দেশটির কৌশলগত পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকবে।
এই কৌশলে চীনের সামরিক সম্প্রসারণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার জন্য সমস্যা হলো—নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিকভাবে চীনকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে
অস্ট্রেলিয়া শুধু সেনা সহযোগিতাই বাড়াচ্ছে না, সামরিক অবকাঠামোতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করছে।
দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটি দীর্ঘপাল্লার মার্কিন বোমারু বিমান পরিচালনার উপযোগী করে উন্নত করা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে গঠিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় অস্ট্রেলিয়া পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পাওয়ার পরিকল্পনাও করছে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার বিষয়টি আগের মতো নেই।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের গবেষক চার্লস লায়ন্স-জোনসের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ অস্ট্রেলীয় মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। একইভাবে মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ চীনের ক্ষেত্রেও এমন আস্থা প্রকাশ করেছেন।
এই তথ্য দেখায়, সরকার ও জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নির্ভরতা
চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হলেও ২০১০-এর দশকে চীন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়।
চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে অস্ট্রেলিয়ার খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। দুই দেশের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অস্ট্রেলিয়ার সংসদেও বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং ২০১৫ সালে দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে।
তবে এই ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
২০২০ সালে করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানালে চীন আপত্তি জানায় এবং অস্ট্রেলিয়ার পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এরপর ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়া চীনের বৃহৎ অবকাঠামো উদ্যোগের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া রাজ্যের একটি চুক্তি বাতিল করে।
চীনে আটক হওয়া কয়েকজন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছিল। সাংবাদিক চেং লেই তিন বছরের বেশি সময় আটক থাকার পর ২০২৩ সালে মুক্তি পান।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হলেও সমস্যা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের জুনে চীন অস্ট্রেলিয়ার গরুর মাংসের ওপর ৫৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
চীনকে কীভাবে দেখছে অস্ট্রেলীয়রা
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও চীন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লোয়ি ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ অস্ট্রেলীয় চীনকে নিরাপত্তা হুমকির চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখেন।
গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১১ শতাংশ বেড়েছে।
তবে চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলীয়দের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে। অনেকের মতে, ইউরোপের কয়েকটি দেশ অস্ট্রেলিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে, কারণ তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি।
একই জরিপে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ অস্ট্রেলীয় মনে করেন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পরাশক্তির সংঘাতে মাঝামাঝি অবস্থান
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড সম্প্রতি দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির বড় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, চীনের উত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অস্ট্রেলিয়ার জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মারিনা ইয়ু ঝাং মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আগের মতো অন্ধ আস্থা এখন আর নেই।
তার মতে, অনেক মানুষ এখন প্রশ্ন করছেন—যুক্তরাষ্ট্র কি আগের মতো নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে থাকবে?
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী, কিন্তু চীন প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়া নয়, বরং দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা।
কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া যেমন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তেমনি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করাও দেশটির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে অস্ট্রেলিয়ার কূটনীতি তাই এক ধরনের ভারসাম্যের খেলা—যেখানে নিরাপত্তা ও অর্থনীতি, মিত্রতা ও স্বার্থ, দুই দিকই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।

